Header Ads

ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের ইতিবৃত্ত

ফয়েজাবাদকে মনে করা হত মুসলিম-নগরী। কারণ কিছু দিন তা ছিল আওয়াধের নবাবদের রাজধানী। এই ফয়েজাবাদেরই একটি অংশের নাম অযোধ্যা। এর সাথেও রয়েছে মুসলমানদের ভক্তি ও ভালবাসার সম্পর্ক। ধারণা করা হয় যে, হযরত আদম আ.-এর পুত্র শীছ আ.-এর কবর এখানে আছে এবং চারপাশে আছে আরো বহু বুযুর্গানে দ্বীনের কবর। তদ্রূপ হযরত নূহ আ., হিন্দ ইবনে নূহ ও হযরত আয়্যূব আ.-এর কবরও এখানে আছে বলে মনে করা হয়। আল্লাহই ভালো জানেন।
এছাড়া অযোধ্যার মাটিতে আছে বখশী বাবা রাহ., লালশাহ বায কলন্‌দর রাহ., জঙ্গি শহীদ রাহ., ইলাহী বখশ মাজযূব রাহ., আলম বখশ রাহ., শাহ মাদার রাহ., সাইয়েদ জালালুদ্দীন খোরাসানী রাহ., শাহ ছামান ফরিয়াদরাছ রাহ., হযরত জামালুদ্দীন শাহ ইবরাহীম রাহ., শাহ চপ রাহ., কাযী কুদওয়াহ রাহ., সুলতান মূসা আশেকান রাহ., শাহ আলী আকবর মীর কুশাবী রাহ., বাহাদুর শাহ, মকন শাহ রাহ., কুতুব শাহ, শাহ বদীউদ্দীন রাহ., হযরত জালালুদ্দীন রাহ. এবং হযরত সাইয়েদ সালার মাসউদ গাযী রাহ.-এর শহীদ মুজাহিদদের কবর। এ অঞ্চলের মুসলিম বাসিন্দারা ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে এসব স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন।
এখানে আছে সুন্দর সুন্দর মসজিদ। স্বর্গদুয়ারী মসজিদ তো এত উঁচু যে, কয়েক মাইল দূর থেকেও চোখে পড়ে।
খাজা নিজামুদ্দীন আওলিয়া রাহ.-এর মশহূর খলীফা নাছীরুদ্দীন চেরাগ আওয়াধী ছুম্মা দেহলভী রাহ.-এর খানদান এখানে আবাদ হয়েছেন। ১৮৮১ সালের এপ্রিল গেজেটিয়ারে ডব্লুডব্লু হান্টার অযোধ্যা সম্পর্কে লিখেছিলেন যে, ‘এখানে ছত্রিশটি মসজিদ রয়েছে।’
এই শহর বৌদ্ধ-ধর্মেরও বড় কেন্দ্র ছিল। এক বর্ণনা মতে, গৌতম বুদ্ধ এখানে নয় বা উনিশ বছর অবস্থান করেছেন। একসময় এখানে বিশটি মঠ ও তিন হাজার ভিক্ষুর বসবাস ছিল। এখন সেসবের চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট নেই।
এটি জৈনধর্মেরও পাঁচজন গুরুর জন্মভূমি। তারা এখানে বসবাস করেছেন। তাদের মন্দিরও এখানে ছিল।
আর হিন্দুদের কাছে তো এটি তীর্থস্থান। কারণ, হিন্দুধর্মে কিংবদন্তী আছে যে, রামচন্দ্রজী এখানেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং রাজত্ব করেছেন। মৃত্যুর পর এখানেই তার দাহ হয়েছে।
সম্ভবত এটি অযোধ্যার মাটির বৈশিষ্ট যে, প্রাচীন কাল থেকেই তা ছিল সর্বধর্মের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের বিচরণকেন্দ্র। এটি এ ভূখণ্ডের একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, যা অক্ষুণ্ন রাখা অতি জরুরি। বিশেষ কোনো ধর্মের একাধিপত্যের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত করে দেওয়া সমীচীন হবে না।
এই বৈচিত্রের কারণেই মঠ ও মন্দিরের মতো এখানে নির্মিত হয়েছে অনেক মসজিদ। বাবরি মসজিদ তার একটি। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থে একে বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করেছে।
মাঝে দীর্ঘদিন এ নিয়ে তেমন উচ্যবাচ্য ছিল না, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ করেই উত্তেজনা দেখা দেয়। বর্তমান লেখক এ বিষয়ে মাআরিফের পাঁচ সংখ্যায় ‘শাযারাত’ লিখেছি, যা গোটা হিন্দুস্তানে আগ্রহের সাথে পঠিত হয়েছে। পাঠকবৃন্দ লেখাগুলি পুসি-কা আকারে প্রকাশেরও অনুরোধ করেছেন। ইতিমধ্যে আরো কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাই বিষয়টির পুনঃঅধ্যয়নের পর নির্ভরযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি একজায়গায় সংকলিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে, যাতে বিষয়টি বোঝা সহজ হয় এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলিরও অবসান ঘটে। বর্তমান পুসি-কাটি এই চিন্তার ফলাফল, যা এখন পাঠকের হাতে রয়েছে।
১৯৪৭-এর আগে পাকিস্তান-আন্দোলনের সমর্থকরা দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রচার করেন এবং এরই ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দুই ভাগ হয়। সাতচল্লিশের পর জাতীয় ঐক্য ও সমপ্রীতি এবং অভিন্ন জাতীয়তার ধারণা জোরেসোরে প্রচার করা হয়েছে এবং এর কিছু সুফলও পরিলক্ষিত হয়েছে। ৪৭ থেকে এ পর্যন্ত অনেক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সংঘটিত হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক অটুট ছিল। সম্ভবত মুসলিম-সমপ্রদায়ের অবমাননার হীন উদ্দেশ্যে এক কট্টর হিন্দুর পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে কুরআন মজীদের মুদ্রণ ও প্রচার নিষিদ্ধ করার জন্য একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। তখন প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের অসামান্য সহানুভূতি ও আইনী পদক্ষেপের কারণে তা আর অগ্রসর হতে পারেনি, যার কারণে মুসলিম জনগণ উভয় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েছেন। তদ্রূপ শাহবানু মামলায় মুসলিম তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ভরণ-পোষণের বিষয়ে যখন সুপ্রিম কোর্ট কুরআনবিরোধী রায় দিয়েছিল তখন মুসলমানদের ব্যাপক গণঅসন্তোষও প্রশমিত হয়েছিল পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার পর। কিন্তু বাবরি মসজিদকে রাম-মন্দিরে পরিণত করার বিষয়ে ছিয়াশির ফেব্রুয়ারিতে আদালত প্রদত্ত রায় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি প্রমাণ করে যে, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও অভিন্ন জাতীয়তার যে পাঠ এতদিন উভয় সমপ্রদায়কে দেওয়া হয়েছে তা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে।
তবে আনন্দের বিষয় এই যে, এ সময় কিছু হিন্দু লেখক-বুদ্ধিজীবী বাবরি মসজিদ ও রাম-জন্মভূমি সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন এবং সামপ্রদায়িক গোষ্ঠীকে শান্তভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী পণ্ডিত লোকপতি ত্রিপাঠির দীর্ঘ বিবৃতি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বক্তব্যের কোনো কোনো অংশের সাথে দ্বিমতের অবকাশ থাকলেও অনেক কথাই গভীর মনোযোগের দাবিদার। যেমন, তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে (প্রাচীন) অযোধ্যার কোনো অস্তিত্বই নেই। তুলশি দাসের রামায়ণে বলা হয়েছে, অযোধ্যা ... ডুবে গিয়েছিল। আজকের অযোধ্যা আওয়াধের নবাবদের প্রতিষ্ঠিত।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘রাম-জন্মভূমির আন্দোলন শুরু হয়েছে আমেরিকাতে। এই আন্দোলনের কারণে রথযাত্রা বের করা হয়েছে। আমি শতভাগ নিশ্চিত যে, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর জন্য অযোধ্যায় সিআইএর এজেন্টরা তৎপর।’
তিনি আরো বলেন, ‘সকল উসকানী ও নির্যাতনের মুখেও ভারতের মুসলমানরা গভীর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। যারা ভারতবর্ষের সর্বত্র হিন্দু সামপ্রদায়িকতা ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের এজেন্টরা মুসলমানদের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।’’
পাটনার একটি হিন্দি সাপ্তাহিকের ... এক প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, অযোধ্যার হিন্দু-মুসলিম অধিবাসীদের মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির লক্ষ্যেই ইংরেজরা বাবরি মসজিদ ও রাম জন্মভূমির বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। প্রবন্ধকার হুমায়ুনকে লিখিত বাবরের (ঐতিহাসিক) অসিয়তনামাটিও উদ্ধৃত করেছেন। বর্তমান পুস্তিকায় আমরা তা নকল করেছি। প্রবন্ধকার লিখেছেন যে, এই অসিয়তনামার নকল জাতীয় সংগ্রহ শালায় সংরক্ষিত আছে। প্রবন্ধকার আরো লেখেন, ‘হুমায়ুন তার পিতার আদেশে বেনারসের জগন্নাথ মঠকে মির্জাপুর জেলায় তেরোশ একর জমি দান করেছিলেন। ঐ হুকুমনামাটি এখনো জগন্নাথ মঠের (গ্রন্থশালায়) সংরক্ষিত আছে।’
দিল্লীর ডক্টর আর এল শাকলা ও প্রাবন্ধিক চিত্তানন্দ দাশ গুপ্তের এ বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধও এই পুস্তিকায় উদ্ধৃত হয়েছে।
গত জুনে (১৯৮৬ ঈ.) ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার নয়াদিল্লীতে হিন্দু-মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। বাবরি মসজিদ ইস্যুতে আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সর্বশ্রেণীর জনগণ সব ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে বিরত থাকবেন, উদার মনোভাব ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিবেন এবং বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করবেন। দেশে এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য সবাই অঙ্গিকারাবদ্ধ হবেন, যেখানে সমাজের কোনো অংশ নিজেদেরকে অনিরাপদ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করবে না এবং যেখানে সত্যিকার অর্থেই সাম্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
আমরাও মুসলমানদের পক্ষ থেকে বলতে পারি যে, রাম-মন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে প্রমাণ হলে সে মসজিদ ভেঙ্গে দিতে কোনো আপত্তি নেই; বরং জবরদখলকৃত জমির উপর নির্মিত মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়াই কর্তব্য। তাতে নামায পড়ার ফতোয়া কোনো ফকীহ বা আলেম দিতে পারেন না। তবে প্রমাণ করার জন্য নির্ভরযোগ্য ও সমসাময়িক সূত্রের উদ্ধৃতি লাগবে। ইংরেজ-আমলের গেজেটিয়ার, প্রত্নতাত্বিক রিপোর্ট কিংবা নিছক জনশ্রুতি এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তদ্রূপ মুসলমানদের ঐসব বই-পুস্তক ও প্রবন্ধ-নিবন্ধও গ্রহণযোগ্য নয়, যা দাঙ্গা-হাঙ্গামার সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে কিংবা ইংরেজদের মুসলিম-বিরোধী প্রচারণার পর লিপিবদ্ধ হয়েছে। ইংরেজরা মুসলিম-বিদ্বেষ তৈরির জন্য অবিরাম এই প্রপাগাণ্ডা করেছে যে, মুসলমানরা যেখানেই যায় ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। গোড়া থেকে এটাই তাদের ধর্মীয় নীতি।
অথচ এই কথাগুলি লেখার সময় ঐ ইংরেজ লেখকরা ভুলে গিয়েছিলেন যে, খৃস্টবাদের ইতিহাস অন্য ধর্মের উপাসনালয়; বিশেষত মুসলমানদের মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় পরিপূর্ণ। মুসলমানরা দু’ শো বছর সিসিলি শাসন করেছেন, এরপর শাসনক্ষমতা খৃস্টানদের হাতে যাওয়ার পর মুসলমানদের অসংখ্য মসজিদ ও ইমারত কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তা একজন খৃস্টান ঐতিহাসিকের মুখ থেকেই শুনুন। এসবি.স্কট অত্যন্ত দুঃখ করে বলেছেন যে, সিসিলিতে মুসলমানদের ছিল অসংখ্য মসজিদ ও ইমারত। অপূর্ব নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্য-সৌন্দর্যের কারণে এগুলো ছিল গোটা মুসলিম-জাহানের গর্বের বস'। কিন্তু আজ সেগুলোর চিহ্নমাত্রও অবশিষ্ট নেই। উচ্ছৃঙ্খল জনতার নির্বিচার ভাংচুর আর গির্জার সামপ্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার হয়ে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। (আখবারুল আনদালুছ ২/৭৫)
স্পেনে মুসলমানরা ছিলেন প্রায় ৮০০ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বহু আলীশান মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। কর্ডোভা ও আলহামরার শানদার মসজিদসমূহ ছিল স্থাপত্য-সৌন্দর্যের বিশ্বসেরা নমুনা। কিন্তু শাসন-ক্ষমতা খৃস্টানদের হাতে যাওয়ার পর হাজার হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে এবং গির্জা ও ঘরবাড়িতে পরিণত করা হয়েছে।
ক্রুসেডের সময় ক্রুসেডাররা যেভাবে জেরুজালেমের মসজিদগুলো ধ্বংস করেছে তার ইতিহাস অত্যন্ত মর্মান্তিক।
আঠারো শতকের মাঝমাঝি সময়ে রুশ ও তুর্কীদের মাঝে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড ক্রেসি বলেন, রুশ সৈনিকরা গর্ব করে বলত যে, ঐ যুদ্ধে তারা ছয় হাজার ঘরবাড়ি ও আটত্রিশটি মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
মোটকথা, খৃস্টানদের ইতিহাসে এ জাতীয় দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
একথা কেউ দাবি করতে পারবে না যে, মুসলিম-বাহিনীর দ্বারা ভারতবর্ষের কোথাও কোনো মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হয়েছে, তবে কোন মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং কেন, তা বলার সুযোগ মুসলমানদের দেওয়া উচিত।
মুসলিম-বাহিনীকে তিন ধরনের হিন্দুর মুখোমুখি হতে হয়েছে : ১. হরবী বা যুদ্ধরত ২. আধা হরবী, ৩ ওফাদার ও অনুগত।
হরবী হল ঐসব হিন্দু, যারা সাধারণত আঞ্চলিক শাসনক্ষমতার জন্য যুদ্ধরত ছিল এবং মুসলমানদেরকে বহিষ্কার করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এই সব অঞ্চলে যুদ্ধাভিযান চলাকালীন কিছু মন্দির ধ্বংস হয়েছে। তবে তা ধর্মীয় প্রেরণা থেকে নয়, যুদ্ধাভিযানের প্রয়োজনে হয়েছে। এমন দৃষ্টন্তও কিছু কম নয় যে, হরবী হিন্দুরা যখন বিজয়ী হয়েছে তখন নির্বিচারে মুসলমানদের ইবাদতখানা ধ্বংস করেছে। এ পুস্তিকায় দেখানো হয়েছে যে, আওরঙ্গযেবের আমলে রাজা ভীম সিং গুজরাটের একশ মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
আধা হরবী, আধা ওয়াফাদার হল ঐসব হিন্দু, যারা যুদ্ধে পরাজিত হলে সন্ধি করত এবং আনুগত্য প্রকাশ করত। আর কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে বিদ্রোহ করত এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করত। সেসময় অনেক মন্দির এদের বিদ্রোহী কর্মতৎপরতার আখরায় পরিণত হত। ফলে ঐসব মন্দিরেও অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে। একে তুলনা করা যায় শিখদের স্বর্ণমন্দিরে হিন্দু-অভিযানের সাথে। স্বর্ণমন্দির শিখ সন্ত্রাসীদের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সেনাঅভিযান ছিল অপরিহার্য। মুসলিম-শাসনামলেও বিদ্রোহ দমনের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। শিখরা যদি অভিযোগ করে যে, সরকার সামপ্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বশবর্তী হয়েই স্বর্ণমন্দির ধ্বংস করেছে তাহলে তা কি যথার্থ হবে? হবে না। মন্দিরের বিষয়ে আওরঙ্গযেবের সশস্ত্র ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোকেও এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয় প্রকার হিন্দু, যারা ছিলেন মুসলিম হুকুমতের ওফাদার, তাদের মন্দির-মূর্তি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। এজন্য আগ্রা ও দিল্লীর ফরমাবরদার হিন্দুদের মন্দির ধ্বংসের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
কিছু মন্দির অশ্লীলতার আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিল। স্বয়ং হিন্দুদের ইঙ্গিতেই এসব মন্দির ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
দেশবাসীর ভেবে দেখা উচিত যে, শত শত বছর আগের পুরোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে গোটা দেশে হিংসা ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া কি দেশপ্রেম হতে পারে? এই প্রবণতা প্রশ্রয় পেলে তো শুধু কাঁদা ছোড়াছুড়িই হবে। বিষ্ণু-মন্দিরের পুজারীরা কতগুলো শিবমন্দির আর শিব-মন্দিরের পুজারীরা কতগুলো বিষ্ণু মন্দির ধ্বংস করেছে কিংবা হিন্দুরা কতগুলো বৌদ্ধ-মন্দির আর বৌদ্ধরা কতগুলো হিন্দু-মন্দির ধ্বংস করেছে কিংবা জৈন ধর্মের অনুসারীরা বৌদ্ধদের কোন কোন স্থানের অবমাননা করেছে এই বিতর্কই চলতে থাকবে। এসব বিষয়ের বিস্তারিত পরিসংখ্যান লিপিবদ্ধ করা হলে একটি দীর্ঘ গ্রন্থ প্রস্তুত হবে।
হিন্দুরা অবশ্য ঐসব মন্দিরের তালিকা তৈরি করে রেখেছে, যেগুলো মুসলিম-আমলে মুসলমানদের হাতে ধ্বংস হয়েছে। তবে মুসলমানদের নির্ভরযোগ্য গ্রন'সমূহেও এই বিবরণ সংরক্ষিত আছে যে, খোদ মুসলিম-শাসনামলে হিন্দুরা কতগুলো মসজিদ শহীদ করেছে। ১৯৪৭ সালের পর তো, সরকারি রিপোর্টের মাধ্যমেই প্রমাণ করা যায় যে, অসংখ্য মসজিদ থেকে মুসলমানদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, দেশের শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্ম-পরিকল্পনার পরিবর্তে যদি শুধু বিদ্বেষ-বিভক্তিই ছড়ানো হতে থাকে তাহলে তো গোটা ভারতে শুধু প্রতিহিংসার আগুনই জ্বলতে থাকবে। খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখা উচিত যে, এটা কি দেশপ্রেম হবে, না দেশদ্রোহিতা?
বাবরি মসজিদের ফলকগুলিই প্রমাণ করে যে, এই মসজিদ শুধু ইবাদতের জন্যই নির্মিত হয়েছে। রাম-মন্দিরের সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। ১৫২৮ ঈ. থেকে ১৮৫৫ ঈ. পর্যন্ত এটি মসজিদই ছিল। ১৮৮৫-এর মামলায় একে মসজিদ বলেই স্বীকার করা হয়েছে এবং যথারীতি মসজিদ হিসেবেই এর রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, কিন্তু যারা মনে করেন, অযোধ্যার ভূমিতে একমাত্র হিন্দুদেরই অধিকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সমপ্রদায় হিসেবে তাদের মর্জিই সর্বক্ষেত্রে শিরোধার্য তারাই এই মসজিদটিকে মন্দির বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, কিছু ভুল এমনও আছে, যে সম্পর্কে ভুলকারী বেখবর থাকলেও শত শত বছর পর্যন্ত এর কুফল চলতে থাকে।
আইনে আকবরিতে অযোধ্যা
একজন ইতিহাসবিদের কাছে এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুপ্রবেশেরন আগে অযোধ্যার গুরুত্ব কতটুকু ছিল এবং মসজিদ-মন্দির সংক্রান্ত বিতর্ক ও বিবাদ ঐ সময়ও ছিল কি না। আবুল ফযল ‘‘আইনে আকবরি’’র প্রথম জিলদের দ্বিতীয় হিস্যায় অযোধ্যার কথা বলেননি। তবে আওয়াধ সম্পর্কে লিখেছেন যে, ‘আওয়াধ হিন্দুস্তানের বড় শহরগুলির একটি। প্রাচীনকালে এর জনবসতি দৈর্ঘ্যে ১৪৮ ক্রোশ ও প্রস্থে ২৬ ক্রোশ বিস্তৃত ছিল। এটি একটি পবিত্র স্থান। শহরের আশপাশের জমি খনন করলে সোনা পাওয়া যায়। এটি ছিল রাজা রামচন্দ্রের আবাসভূমি, যাকে মনে করা হয় ত্রেতা-যুগের* নেতা ও আধ্যাত্মিক গুরু। শহরের অদূরে সাত গজ ও ছয় গজ লম্বা দু’টি কবর আছে। জনশ্রুতি হল, তা হযরত শীছ আ. ও হযরত আইয়ুব আ.-এর কবর। কবর দু’টি সম্পর্কে অনেক আশ্চর্য কথা প্রচলিত আছে। আরো বলা হয়, রতনপুরে একজন সিকান্দার লোধির আমলের সাধু পুরুষ কবীর দাশের কবর আছে। লোকে বলে, আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে সে সংসারত্যাগী হয়েছিল এবং ধর্মের বিধান থেকেও স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। হিন্দিতে কবীর দাশের কিছু কবিতা আছে, যা তার বৈরাগ্য ও স্রষ্টার-অন্বেষণের উত্তম দৃষ্টান্ত।-আইনে আকবরী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা : ৭৮ (উল্লেখ্য, রতনপূরে কবীরের কবর নেই)
এখানে কোথাও বলা হয়নি যে, বাদশাহ বাবর রামমন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। অথচ বাবরের শাসনামলের আগেই অযোধ্যায় মুসলিম-বসতি স্থাপিত হয়েছিল।
অযোধ্যায় মুসলমানদের বসবাস
আইনে আকবরির উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে জানা যায় যে, এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের ধারণা, এখানে হযরত শীছ আ. ও হযরত আইয়ুব আ.-এর কবর আছে। এই ধারণা বাস্তব কি অবাস্তব তা ভিন্ন প্রসঙ্গ তবে এটুকু বোঝা যায় যে, এই স্থানের সাথে মুসলমানদেরও আবেগ ও ভক্তি জড়িয়ে আছে।
হযরত শীছ আ.-এর কবরের চারপাশে আছে অনেক অলি-আওলিয়ার কবর। আরো আছে সালার মাসউদ গাযী রাহ.-এর মুজাহিদ সাথীদের কবর, বখশী বাবা রাহ., হযরত লা’ল শাহ বায কলন্দর রাহ., হযরত সাইয়্যেদ আলাউদ্দীন খোরাসানি রাহ., হযরত জামালুদ্দীন কাযি কুদওয়াহ রাহ., হযরত সুলতান মূসা আশেকান রাহ. এবং পীর কুশাবি রাহ.-এর কবর। এঁদের জীবনী থেকে বোঝা যায়, বাবরের আগেই এঁরা অযোধ্যায় এসে বসতি স্থাপন করেছেন এবং আমমানুষকে ফুয়ূয ও বারাকাত দ্বারা ধন্য করেছেন।
হযরত নাসীরুদ্দীন চেরাগে দেহলী রাহ.-এরও পৈত্রিক নিবাস অযোধ্যায়। বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর জন্মও হয়েছিল অযোধ্যায়। বংশীয় সূত্রে তিনি হোসাইনী সাইয়েদ। অর্থাৎ সে আমলে অযোধ্যায় সাইয়েদগণও বসতি স্থাপন করেছিলেন। সুতরাং এখানে এক বা একাধিক মসজিদ থাকা খুবই স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্যের কী আছে?
বিবাদের সূচনা
মোঘল-আমলের ইতিহাসে রাম-মন্দির ও বাবরি মসজিদ বিতর্কের কথা পাওয়া যায় না। মোঘল-শাসন দুর্বল হওয়ার পর আওয়াধে নবাবদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শাসনও যখন দুর্বল হল তখন এ অঞ্চলের রাজনীতিতে ইংরেজদের অনুপ্রবেশ ঘটে। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলেই (১৭৭২-৮৫) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফ থেকে এখানে শান্তিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করা হয়। এর ব্যয়ভার ছিল নবাবের উপর। একপর্যায়ে বাহিনীর সদস্যসংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়, যার ব্যয়ভার বহন করা নবাবের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইতিহাসে আছে, হেস্টিংস তখন বেগমদের গহনা ছিনিয়ে নিয়ে এই অর্থ উসূল করেছিল। এ থেকে বোঝা যায়, নবাব তখন সম্পূর্ণূরূপে ইংরেজ-কৃপাধীন হয়ে পড়েছিলেন। লর্ড ওয়েলেসলির আমলে এই বাহিনীর সৈন্য-সংখ্যা দশ হাজার অতিক্রম করে, যাদের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য নবাবকে তার অর্ধেক এলাকা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হয়। লর্ড লরেন্সের সময় সেখানে একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট অবস্থান করতে থাকেন, যিনি সেনা-সহায়তায় রাজ্য-শাসনেরও মালিক-মোখতার হয়ে উঠেছিলেন। লর্ড ডালহৌসির সময় নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ কার্যত পুতুল নবাবে পরিণত হন। এ আমলের বিস্তারিত ইতিহাস যেকোনো ইতিহাস-গ্রন্থেই পাওয়া যাবে। খোদ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ তার ‘মছনবিয়ে হুযন-আখতার’ কাব্যে লিখেছেন-
‘‘ওয়াজেদ আলী ইবনে আমজাদ আলী শোনাবে এখন তার দুঃখের কাহিনী। রাজ্য-শাসনের যখন হল দশ বছর, তখন ডুবল ভাগ্য তারকা।’’
গভর্নরের ফরমান এল-ছেড়ে দাও মসনদ সালতানাতের। শাহে আওয়াধ বলা হত যাকে, এই হল পরিণাম তার হুকুমতের।
ডালহৌসির পত্রে ছিল লেখা, প্রজারা তোমার নারাজ। আর তুমি হলে এক ব্যর্থ রাজা।
‘‘এই পত্র নিয়ে এসেছিল জেনারেল ওটার্ম। সাথে ছিল জবরদস্ত ইংরেজ ফৌজ, এসেছিল যেন ছুটে দরিয়ার মৌজ।’’
সাইয়েদ কামালুদ্দীন হায়দার হাসানী আল হোসায়নী আলমাশহাদী তার ‘‘কায়সারুত তাওয়ারীখ ইয়া তাওয়ারীখের আওয়াধ’’ কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের সাথে লর্ড ডালহৌসি, রেসিডেন্ট জেনারেল সিলম্যান ও জেনারেল ওটার্ম প্রমুখের আচরণের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
এই সময়ই অযোধ্যায় মসজিদ-মন্দির বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে, যার পরিণতিতে আঠার শ পঞ্চান্ন সালে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এর পিছনে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এ অঞ্চলের শাসন-ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করতে হলে এখানকার অধিবাসীদের মাঝে দন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করতে হবে। আওয়াধের কর্তৃত্ব হস্তগত করার পর থেকেই অযোধ্যা তাদের অপতৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লীতে মুসলিম-শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১২০৫ খৃস্টাব্দে। এরপর থেকে মুসলমানরা সেখানেই আবাদ হয়েছেন সেখানেই মসজিদ নির্মাণ করেছেন, ইমাম-মোয়াযযিন নিয়োগ করেছেন, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা এবং দরবেশদের জন্য খানকা নির্মাণ করেছেন, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন, মুদাররিস নিয়োগ দিয়েছেন। একইভাবে অযোধ্যায় মুসলমানদের আগমনের পর এখানেও মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এই শহরকে হিন্দুরা পবিত্র স্থান মনে করত। আওয়াধের কর্তৃত্ব দখল করার পর ইংরেজদের হাতে অযোধ্যায় মসজিদ-মন্দির বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ এল।
তারা রাজ্য-ক্ষমতা দখল করছিল মুসলমানদের কাছ থেকে তাই হিন্দুদের সমর্থন ও সহযোগিতা তাদের প্রয়োজন ছিল। তারা হিন্দুদের উত্তেজিত করার জন্য প্রচার করতে থাকল যে, অযোধ্যার অধিকাংশ মসজিদ হিন্দুদের মন্দির ভেঙ্গে কিংবা তাদের কোনো পবিত্র স্থানে নির্মিত। এই পুস্তিকাতেই আলেকজান্ডার কেনিংহামের যে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে তাতেও এ বিষয়টি পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ইংরেজরাই তাদের গেজেটিয়ার ও প্রত্নতাত্ত্বিক রিপোর্টসমূহে ঐসব পবিত্র স্থান সম্পর্কে লিখত যে, এগুলো বিরান হয়ে বন-জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। পরে সেগুলো নিছক অনুমানের ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয়েছে। এ জাতীয় বক্তব্যের একটি উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা, তারা যেন হিন্দুদের দাবি মেনে না নেয়।
ইংরেজদের কুটকৌশলী সমর্থন মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুদের দিকেই বেশি ছিল। তারা ব্যাপকভাবে প্রপাগান্ডা করল যে, মুসলমান যেখানেই যায় সেখানকার অধিবাসীদেরকে ধর্মত্যাগে বাধ্য করে এবং তাদের উপাসনালয় ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করে।
এইসব মিথ্যাচার প্রমাণ করার জন্য যদি কোনো দায়িত্বহীন ঐতিহাসিক কিংবা ইসলামী বিধিবিধান সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলিম লেখকের উদ্ধৃতি কিংবা অনির্ভরযোগ্য বইপত্রের বিবরণ উপস্থিত করা হয় তবুও একজন ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, বাস্তবে যদি এটাই হত মুসলমানদের নীতি তাহলে কি আজ গোটা ভারতবর্ষে একটি মন্দিরও দেখা যেত? মুসলিম-বাহিনী তো কাশ্মীর থেকে রাসকুমারী পর্যন্ত এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত গোটা ভূখন্ড জয় করেছিল। এসব অঞ্চলে এত প্রাচীন মন্দির তাহলে কীভাবে রয়ে গেল?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন অমুসলিমকে যেসব অধিকার দিয়েছেন তা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। পাঠক দেখেছেন যে, আহলে কিতাব সম্প্রদায়, অর্থাৎ যাদের কুরআন মজীদের উপর ঈমান নেই, তবে কুরআনে উল্লেখিত কোনো আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী, তাদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান এই যে, তারা ইসলামি হুকুমতের প্রতি ওয়াফাদার ও বিশ্বস্ত থাকলে তাদের উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপদ থাকবে এবং তাদের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রুর পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। আর ধর্মত্যাগে বাধ্য করার তো প্রশ্নই আসে না। এদের নারীদেরকে মুসলিম পুরুষগণ বিবাহ করতে পারে এবং তাদের যবেহকৃত প্রাণী ও তাদের হালাল খাবার মুসলমানরা খেতে পারে।
কিছু সম্প্রদায় আছে, যারা উপরোক্ত কোনো আসমানী কিতাবকে স্বীকার করে না তবে অন্য কোনো ঐশী গ্রন্থে বিশ্বাসের দাবি করে। যেমন ছাবি, মাজূছি (অগ্নিপুজারী), হিন্দু ও বৌদ্ধ। মুসলমান তাদের নারীদের বিয়ে করতে পারে না এবং তাদের যবেহকৃত পশু খেতে পারে না। তবে ইসলামি হুকুমতের প্রতি ওয়াফাদার হলে অন্য সকল ক্ষেত্রে তারা আহলে কিতাবের মতোই অধিকার ভোগ করবে। অর্থাৎ তাদের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু নিরাপদ থাকবে এবং তাদের মন্দির ও উপাসনালয় অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আমাদের রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’। আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে তাঁকে এই পয়গাম দেওয়া হয়েছে যে, আপনার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া। লোকেরা যদি গ্রহণ না করে তাহলে এর দায় আপনার নয়। এদের হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার। (সূরা মাইদা : ৯৫; সূরা গাশিয়া : ২৬)
ইসলামের এই উদার নীতির পরও ইংরেজ বেনিয়ারা এই প্রপাগান্ডা করেছে যে, মুসলমানরা অন্য ধর্মের লোকদের জোরপূর্বক মুসলমান বানায় আর তাদের উপাসনালয় ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি করে।
মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান
ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে শরীয়তের অনেক শর্ত-শরায়েত আছে। জবরদখলকৃত জমিতে মসজিদ বানানো সম্পূর্ণ নাজায়েয। ফকীহগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এই যে, আল্লাহর রেযামন্দি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, যেমন যশ ও খ্যাতির জন্য যে মসজিদ বানানো হয় কিংবা যে মসজিদ হারাম উপার্জন দ্বারা বানানো হয় তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘মসজিদে দিরার’ হিসেবে গণ্য। (তাফসীরাতে আহমাদিয়া পৃ. ২৮৩; মাদারিক আলাল খাযিন, খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৬৫)
অর্থাৎ তা মুসলমানদের নয়, মুনাফিকদের মসজিদ।
ফকীহগণ আরো বলেছেন, ‘যে জমিতে অন্যের হক আছে তাতে হক্বদারের সম্মতি ছাড়া মসজিদ বানানো হলে ঐ মসজিদকে বাতিল ঘোষণা করে হকদার তার হক্ব উসুল করতে পারবে।’
এটা এভাবেও বোঝা যায় যে, প্রতিবেশিত্ব বা অংশীদারত্বের কারণে যে জমির উপর কারো হক্বে শোফ‘আ আছে তাতে হক্বদারের সম্মতি ছাড়া মসজিদ বানানো জায়েয নয়। (ফতহুল কাদীর খন্ড : ২,পৃষ্ঠা : ৮৭৫)
তেমনি কোনো ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় নিয়ত করল যে, নিজের ঘরবাড়ি মসজিদ বানিয়ে যাবে এবং মৃত্যুর সময় অসিয়তও করে গেল, কিন্তু অসিয়তে একথা ছিল না যে, পরিত্যক্ত সম্পদের এক তৃতীয়াংশকে মসজিদ বানানো হবে, এক্ষেত্রে ওয়ারিছরা সম্মত না হলে এই অসিয়ত কার্যকর করা যাবে না। কারণ এই সম্পদে ওয়ারিছদের হক্ব রয়েছে। হুকুকুল ইবাদ থেকে আলাদা না করে মসজিদ বানানো সহীহ হয়নি। (ফাতাওয়া আলমগীরী ২/৪৫৬)
বাই ফাসিদের মাধ্যমে কেনা জমিতে মসজিদ বানানো জায়েয নয়। (ফতহুল কাদীর ২/৮৭৫)
তেমনি যেকোনো নাজায়েয তরীকায় প্রাপ্ত জমিতে মসজিদ বানানো জায়েয নয়। যেমন কারো ঘর দখল করে মসজিদ বা জামে মসজিদ বানানো হলে তাতে নামায পড়া নাজায়েয। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৬/২১৪)
মসজিদ সম্প্রসারণের প্রয়োজনে রাস্তার কিছু অংশ যদি মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এ কারণে পথচারীদের অসুবিধা হয় তাহলে তা জায়েয নয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী ২/৪৫৬)
মসজিদ নির্মাণ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হল জমি হালাল তরীকায় গৃহীত হওয়া। হালাল তরীকার ব্যাখ্যা এভাবে করা হয়েছে যে, মসজিদের জমিতে কারো কোনো প্রকারের হক না থাকা। হিদায়া কিতাবে বলা হয়েছে, কেউ যদি এমন কোনো ঘরকে মসজিদ বানায়, যার নীচে ভূগর্ভস্থ কক্ষ আছে কিংবা ওপর তলায় ঘর আছে তো মাঝের ঘরটির মালিকানা ত্যাগ করে মসজিদ বানালেও তা মসজিদ হবে না। সুতরাং মালিক ইচ্ছে করলে তা বিক্রি করতে পারবে এবং তার মৃত্যুর পর ওয়ারিছরা ঐ ঘরের মালিক হবে। কারণ এই ঘরের (কিছু অংশে, যেমন ছাদ ও মেঝে) বান্দার হক ও মালিকানাও যুক্ত থাকায় তা সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য হয়নি। অথচ মসজিদে কারো কোনো ধরনের হক থাকতে পারে না। (হিদায়া)
ফকীহগণ সর্বদা এই নীতি অনুসরণ করেছেন। সমকালীন ফতোয়ার কিতাবেও এ ধরনের অনেক সিদ্ধান্ত রয়েছে। যেমন ফতোয়ায়ে রেজভিয়াতে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, ‘মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। অতএব গোটা মসজিদ বান্দার হক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া অপরিহার্য। কোনো অংশে কারো মালিকানা অবশিষ্ট থাকলে মসজিদ হবে না।’ (ফতোয়ায়ে রেজভিয়া ৬/৪৫৩)
এক প্রশ্নে বলা হয়েছে, মুসলমানরা হিন্দু জমিদারের নিকট থেকে জমি কিনে মসজিদ বানাতে চান। কারণ মুসলমানদের কাছে মওরূসি জমি ছাড়া এমন কোনো জমি নেই, যেখানে মসজিদ বা জামে মসজিদ বানানো যায়। কিন্তু ঐ হিন্দু জমিদার তার জমি বিক্রি করতে রাজি নয়। এমতাবস্থায় মুসলমানরা কী করবেন?
জবাবে বলা হয়েছে যে, ঐ হিন্দু যদি জমি বিক্রি না করে তাহলে মুসলমানরা ঘরেই নামায পড়বে। (ফতোয়া রিজভিয়্যাহ ৬/৪৬১)
কয়েক ব্যক্তির মালিকানাধীন জমিতে এক শরীক অন্য শরীকদের অনুমতি ছাড়া মসজিদ বানাতে পারবে না। এমন জমিতে মসজিদ বানানো হলে তাতে নামায পড়ার ছওয়াব পাওয়া যাবে না; বরং তাতে নামায না পড়াই উচিত। (মজমুআয়ে ফতওয়া মাওলানা আবদুল হাই-আদাবুল মাসাজিদ মুফতী মো. শফী পৃ. ২৫)
তদ্রূপ না-বালিগের জমিতে মসজিদ বানানো জায়েয নয়। (তাতিম্মা ইমদাদুল ফাতাওয়া-আদাবুল মাসাজিদ মুফতী মোহা. শফী পৃ. ২৫)
কোনো পতিতা হারাম উপার্জন দ্বারা মসজিদ বানালে তা মসজিদ হবে না এবং এতে কোনো ছওয়াবও হবে না। (মজমুআয়ে ফতওয়া মাওলানা আবদুল হাই পৃ. ২৬৮)
মোটকথা, মসজিদ বানানোর জন্য শরীয়তের বিধানেই যখন এই শর্ত আছে যে, জমির মালিকানা বৈধ উপায়ে হাসিল হতে হবে, কারো হক নষ্ট করা যাবে না এবং জোরজবরদস্তি করা যাবে না, তখন কীভাবে সম্ভব যে, মুসলিম বিজেতা ও শাসকগণ মন্দির ভেঙ্গে ভেঙ্গে মসজিদ বানাতে থাকবেন? এমন কিছু হলে তো আলিম ও ফকীহগণই সবার আগে প্রতিবাদ করবেন!
হ্যাঁ, এটা স্বীকার করতে কোনো অসুবিধা নেই যে, মুসলিম শাসক ও সেনাপতিগণ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো মন্দির ধ্বংস করেছেন। তবে কী ধরনের মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে এবং কেন করা হয়েছে তা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য বিষয় অর্থাৎ মন্দির ভেঙ্গে ঐ স্থানে মসজিদ বানানোর দাবি কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না।
শরীয়তের হুকুমের তোয়াক্কা না করে কেউ যদি কোথাও এমন কোনো মসজিদ বানিয়েও থাকে তবে তা ফকীহ ও আলিমগণের কাছে মসজিদ বলে স্বীকৃত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। সুতরাং রাজনৈতিক স্বার্থে মন্দিরের জায়গায় মসজিদ বানানোর প্রপাগান্ডা যতই করা হোক ঐতিহাসিকভাবে তা প্রমাণ করা কখনো সম্ভব নয়।
ইংরেজ বেনিয়াদের কাছে সত্য-মিথ্যার পরোয়া ছিল না, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের মনে মুসলিম-বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। এ উদ্দেশ্যে তারা পূর্ণ সফল হয়েছে। বস্ত্তত অযোধ্যার মসজিদ-মন্দির বিতর্ক ইংরেজ বেনিয়াদের প্রপাগান্ডারই ফসল।
একজন ঐতিহাসিকের প্রশ্ন করার অধিকার আছে যে, এই বিতর্ক মোঘল আমলে কেন হয়নি? তর্কের মানসিকতায় কেউ বলতে পারেন যে, ঐ সময় হিন্দুরা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল তাই তারা উচ্চবাচ্য করেনি, কিন্তু ইতিহাস বলে, এই জবাব বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আকবর থেকে শুরু করে পরবর্তী মোঘল শাসকদের দরবারে বড় বড় রাজপুত সর্দার প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। দরবারে ও সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন কৃতিত্বের জন্য বহু পদ ও পদবীও তারা লাভ করেছিলেন, কিন্তু কখনো তারা অযোধ্যার মতো পবিত্র স্থানে মন্দির-অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করেননি; বরং একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে, আজকের অযোধ্যা যত গুরুত্বপূর্ণ ঐ সময় তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এবং ঐ দিকে তীর্থ-যাত্রারও রেওয়াজ ছিল না। বৃটিশ আমলেই এই স্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মন্দির ধ্বংসের প্রসঙ্গ সৃষ্টি হয়।
এই বিবাদের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে বিবদমান তিনটি পক্ষ ছিল : ইংরেজ, হিন্দু ও মুসলমান। ইংরেজরা প্রথমে প্রপাগান্ডা করেছে যে, হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস করে মুসলমানদের মসজিদ বানানো হয়েছে। এরপর হিন্দু-মুসলিম বিবাদ মেটানোর জন্য ইংরেজ বাহিনী ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে। হিন্দুদের দাবি ছিল, ধ্বংসকৃত মন্দিরসমূহ পুনর্নির্মাণ করা হোক এবং ঐসব স্থানে নির্মিত মসজিদগুলো ধ্বংস করা হোক। মুসলমানদের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এইসব প্রচার-প্রচারণা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, ঘটনার সমসাময়িক ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস-গ্রন্থে যার কোনো প্রমাণ নেই। আর বহু যুগ পরের বইপত্রে এইসব কথা পাওয়া গেলে তা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুতরাং মসজিদ স্বস্থানে বহাল থাকবে, তাতে নামায আদায়ে বাধা দেওয়া যাবে না।
অযোধ্যায় মসজিদ-মন্দির বিবাদের সূচনা ১৮৫৫ খৃস্টাব্দে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঐ সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোনো হিন্দু পন্ডিত বা ঐতিহাসিক (বাবরি মসজিদ নির্মাণের) সমসাময়িক কোনো হিন্দি বা সংস্কৃত সূত্র থেকে দেখাতে পারেননি যে, অযোধ্যার মসজিদগুলি হিন্দুদের মন্দির ভেঙ্গে বানানো হয়েছিল। কেবল গুজব ও রটনায় কান দিয়ে এবং ইংরেজদের প্রস্ত্ততকৃত বিবরণে বিশ্বাস করেই হিন্দুরা উত্তেজিত হয়েছেন।
১৯৬০ খৃস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যসরকারের পক্ষ থেকে যে গেজেটিয়ার প্রকাশিত হয়েছিল তাতে অযোধ্যার মসজিদ-মন্দির বিবাদের বিষয়ে কোনো হিন্দি বা সংস্কৃত সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। শুধু মুসলমানদের লিখিত বই-পুস্তক, যেমন মির্জা জান রচিত ‘হাদীকায়ে শুহাদা’ এবং কামালুদ্দীন হায়দার হাসানী-আলহোসায়নী আলমাশহাদীকৃত ‘কায়সারুত তাওয়ারীখ ইয়া তাওয়ারীখে আওয়াধ’-এর উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
‘হাদীকায়ে শুহাদা’র লেখক মির্জা জান অযোধ্যার আঠার শ পঞ্চান্নর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রত্যক্ষদর্শী। তার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে ঐ সংঘর্ষের পর পর। সঙ্গত কারণেই তার উপস্থাপন ঐতিহাসিক সুলভ নয়; বরং সংঘর্ষের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যেমন হয়ে থাকে তেমনি।
পঞ্চান্নর সংঘর্ষে মুসলমানদের পরাজয় ও ব্যাপক মুসলিম-নিধনে লেখক ছিলেন নিদারুণ মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ। এজন্য তার লেখায় চরম ক্ষোভ ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাছাড়া গ্রন্থটি যেহেতু বাবর ও আলমগীরের শাসনামলের অনেক পরে লিখিত তাই তা ঐ স্থানের প্রাচীন মসজিদসমূহের নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠার সন-তারিখের জন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র হতে পারে না।
দ্বিতীয় বইটি অর্থাৎ ‘কায়সারুত তাওয়ারীখ ইয়া তাওয়ারীখে আওয়াধ’ লিখিত হয়েছে খোদ লেখকের বিবরণ অনুযায়ী হেনরি এলিটের ইঙ্গিতে। এর প্রকাশকাল ১৮৯৬ খৃস্টাব্দ। হেনরি এলিয়ট সম্পর্কে এটুকু তথ্যই যথেষ্ট যে, তিনি ‘হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া এজ টোল্ড বাই ইটস ঔন হিস্টোরিয়ান’ নামক দশ খন্ডের ঐ বৃহদাকার গ্রন্থটির রচয়িতা, যা হিন্দু ও মুসলমানের মাঝে এমন বিদ্বেষের আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছে, যা আজ পর্যন্ত নির্বাপিত হয়নি। সুতরাং তার ইঙ্গিতে প্রস্ত্ততকৃত গ্রন্থও যে ইংরেজ বেনিয়াদের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে তা তো খুব সহজেই অনুমেয়।
তবে এ জাতীয় বিবরণ ও উপস্থাপন বাদ দিলেও এই দুটি গ্রন্থে প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য রয়েছে। আমরা এখানে তা একত্র করার চেষ্টা করব।
‘‘হাদীকায়ে শুহাদা’’র লেখক বলেন, ‘অযোধ্যার ফেদায়ী খান সুবেদার রামদরবারের মসজিদটি বানিয়েছিলেন। হিন্দুরা তা এমনভাবে গুড়িয়ে দিল যে, এক কোণায় কিছু দেয়াল ও দুই একটি মিনার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
আমজাদ আলী শাহের আমলে তা পুনর্নির্মাণের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সে আদেশ বাস্তবায়নের আগেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। (পৃষ্ঠা : ৫, লোখনৌ এডিশন)
‘লক্ষণ মোহান্ত কেল্লার মসজিদটি দখল করল। তাতে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার নেই।’ (প্রাগুক্ত)
এই দুইটি মসজিদের পর বৈরাগিদের নজর পড়ল হনুমান গাড়ির মসজিদের উপর।
লেখক বলেন, ‘ঐ স্থানে (অর্থাৎ হনুমান গাড়িতে) গাজি আওরঙ্গজেব একটি মসজিদ বানিয়েছিলেন। হিন্দুরা তা ভেঙ্গে ফেলার পাঁয়তারায় লিপ্ত ছিল।’ (প্রাগুক্ত)
সেখানে আগে থেকে মন্দির থাকলে আওরঙ্গযেব তা ভেঙ্গে মসজিদ বানাতে পারেন না। কারণ বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব ‘ফতোয়া আলমগীরী’ তাঁর আদেশেই সংকলিত হয়েছে। অতএব তাঁর ভালোভাবেই জানা ছিল যে, জবরদখলকৃত জমিতে মসজিদ হয় না। আওরঙ্গযেবের বিদ্বেষী সমালোচক স্যার যদুনাথ সরকারও আওরঙ্গযেবকে অযোধ্যার কোনো মন্দির ভাঙ্গার বিষয়ে অভিযুক্ত করেননি। অথচ তিনি মন্দিরের তালিকা প্রস্ত্তত করে আওরঙ্গযেবকে ঐসব মন্দিরের জায়গায় মসজিদ নির্মাণের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। তাছাড়া ‘কায়সারুত তাওয়ারীখে’ বলা হয়েছে যে, মসজিদটি সম্প্রতি ঐ স্থানে নির্মিত হয়েছিল।
‘‘হাদীকায়ে শুহাদা’’য় এই মসজিদ-ধ্বংসের যে বিবরণ (পৃষ্ঠা : ১১২) আছে তার সারাংশ হচ্ছে, ‘দর্শন সিং ব্রাহ্মণ পশ্চিম রাল্টার নাযিম হওয়ার পর হনুমান গাড়ির টিলায় একটি দেয়াল ঘেরা দুর্গ নির্মাণ করল, যার কারণে ঐ স্থানের বৈরাগিদের শক্তি বৃদ্ধি পেল এবং তারা মসজিদের আকার-আকৃতি পরিবর্তন করতে থাকল। ঐ মসজিদে একটি দেয়াল বানিয়ে তার নাম দিল হনুমান গাড়ি। সকাল-সন্ধ্যা তাতে পুজার আগুন জ্বলত। একপর্যায়ে মিম্বার ও মিহরাব ভেঙ্গে মসজিদটি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল। (হাদীকায়ে শুহাদা, পৃ. ৬-৭)
‘‘কায়সারুত তাওয়ারীখ ইয়া তাওয়ারীখে আওয়াধ’’ গ্রন্থে বলা হয়েছে-‘কিছু কাল আগেও আওয়াধের উচ্চভূমিতে একটি মসজিদ ছিল, যা বিগত সুলতানদের আমলে নির্মিত হয়েছিল। হিন্দুরা ঐ জায়গাটিকে ‘হনুমান গাড়ি’ বলে নামকরণ করল।
মসজিদের পার্শ্বে একটি চবুতরা ছিল, যাতে আশুরার দিন ‘তা’যিয়া’ রাখা হত। একজন দরিদ্র মুসলিম মসজিদটি ঝাড়ু দিতেন। কিছু দিন পর একজন দরিদ্র হিন্দু ঐখানে ঝান্ডা গাড়ল এবং একটি ছোট কক্ষ বানিয়ে তাতে মূর্তি স্থাপন করল। সে জায়গাটির নাম দিল ‘হনুমান-স্থান’। নবাব বোরহানুল মুলকের আমলে কতিপয় হিন্দু মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলে। তখন সরকারী ফৌজ এসে দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তি দেয় এবং মন্দির ভেঙ্গে মসজিদের জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করে। কিছুদিন পর বৈরাগীরা মন্দির নির্মাণ করল এবং মসজিদে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকল। রাজা দরশন বাহাদুর পশ্চিম রাঠ প্রভৃতি স্থানের ক্ষমতা লাভ করলে এ অঞ্চলের হিন্দুদের অর্থ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তখন তারা মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলে এবং মসজিদের জায়গা দুর্গের অন্তর্ভুক্ত করে। রামঘাটদরবারের মসজিদটিও তাদের হস্তক্ষেপের শিকার হল। তারা মসজিদের আঙ্গিনায় বসতবাড়ি তৈরি করল এবং মসজিদের ভিতর ময়লা-আবর্জনা ফেলতে থাকল। মুসলমানদের অসংখ্য কবর ভেঙ্গে ঐ ইট-পাথর দ্বারা সুউচ্চ মন্দির নির্মাণ করল। (খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১১০)
এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, এখানেও দুটি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই মুসলমানদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হল এবং তারা মসজিদ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্ত্তত হলেন। প্রথমে তাদের দলনেতা ছিলেন শাহ গোলাম হুসাইন। তিনি যখন বাবরি মসজিদে অবস্থান নিলেন তখন আলেকজান্ডার আর ও তার বাহিনী সেখানে পৌঁছল। এরপর ফয়েজাবাদ থেকে এল জন হরসি। ‘হাদীকায়ে শুহাদা’র বিবরণ অনুযায়ী ইংরেজদের আগমনে বৈরাগীরা আনন্দিত হল। কারণ ইংরেজদের তারা পক্ষের লোক মনে করত এবং বিশ্বাস করত যে, ইংরেজরা তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। হঠাৎ বৈরাগীরা মসজিদে (অর্থাৎ বাবরি মসজিদে) হামলা করল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। মুসলমান মুজাহিদরা তাদের হামলা প্রতিহত করে হনুমান গড়হির দরজা পর্যন্ত খেদিয়ে নিয়ে গেলেন। অনেক বৈরাগী নিহত হল এবং মুসলমানরা মসজিদে ফিরে এলেন। এ সময় আলেকজান্ডার ও জন হোর্সে মুসলমান মুজাহিদদের নিকট বার্তা পাঠাল যে, এবার নিশ্চিন্ত মনে মসজিদে অবস্থান করুন। (হনুমান গাড়ির) মসজিদের ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত কেউ আপনাদের লক্ষ করে টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করবে না। তাদের কথায় বিশ্বাস করে মুসলমানরা খাবার খেতে লাগলেন এবং দুই ইংরেজ তাদের বাহিনী নিয়ে দূরে গেল। আসলে এটা ছিল বৈরাগীদের জন্য সবুজ সংকেত। হাজার হাজার বৈরাগী অকস্মাৎ মসজিদে আক্রমণ করল এবং কসাই যেভাবে গরু জবাই করে ঠিক ঐভাবে মুসলমানদের জবাই করা হল। মসজিদ-প্রাঙ্গণে রক্তের স্রোত বইতে লাগল। কুরআন মজীদ আগুনে পোড়ানো হল। এরপর মুসলমানদের মৃতদেহ পদদলিত করে হিন্দুরা বাড়ি ফিরে গেল।
‘‘হাদীকায়ে শুাহাদা’’র লেখক বলেন, ‘দুই ইংরেজ অফিসার ও তাদের বাহিনীকে দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের জবাই হওয়ার দৃশ্য দেখল, তাদের কোনো সাহায্যই করল না। অবশ্য তাদের কাছে এই আশা করাও অন্যায়। কারণ এটা তো ছিল আলেকজান্ডার ও জন হোর্সেরই বাহিনী! পরের দিন নেছার হোসাইন কোতোয়াল মসজিদের দরজার সম্মুখে গর্ত খনন করে লাশগুলো সমাহিত করল। (হাদীকায়ে শুহাদা, পৃ. ১০-১৮)
এই ঘটনাটির আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মির্জা আ’লা আলীর বিবরণে এসেছে এভাবে-দুই ইংরেজ অফিসার, আমি ও মির্জা নেছার হোসাইন নিজ নিজ ফৌজ ও তোপ নিয়ে সেখান থেকে সরে এলাম এবং অনেক দূরে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। এদিকে এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হাজার হাজার বৈরাগী গুলি করতে করতে এগিয়ে গেল এবং মসজিদ ঘেরাও করে ফেলল। তারা রজব আলী শাহ ফকীরের কুঠিতে চড়ে গোলাম হোসাইনের সঙ্গীদের দিকে গুলি বর্ষণ করতে থাকল। এরপর মসজিদে ঢুকে ২৬৯ জন মুসলমানকে জবাই করল এবং লাশগুলো টুকরা টুকরা করে ফেলল। মসজিদে রক্তের স্রোত বয়ে গেল। মসজিদের কুরআন মজীদগুলোও ছিড়ে টুকরা টুকরা করল এবং (নাউযুবিল্লাহ) পদদলিত করে আগুনে পোড়ালো। মসজিদের দেয়ালগুলি ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের লাশ কাফন-দাফনহীন পড়ে রইল। পরের দিন মির্জা নেছার হোসাইন মসজিদের দরজায় একটি বড় কবর খুড়ে লাশগুলি দাফন করল। (খ. ২, পৃ. ১১২)
‘‘হাদীকায়ে শুহাদা’’য় আছে যে, ‘বাবরি মসজিদের চরম অবমাননা ও মুসলমানদের নৃশংসভাবে হত্যা করার পর বৈরাগীর দল মসজিদের আঙ্গিনায় হোম করল ও শাঁখ বাজাল। বীর হনুমানের জয়ধ্বনি করল যে, তাঁর কৃপায় অযোধ্যা ম্লেচ্ছমুক্ত হয়েছে এবং এই আনন্দে মোহন ভোগ খেল।
মোটকথা এমন কোনো অবমাননা নেই, যা তারা বাকি রাখল। মসজিদের অদূরে উঁচু ভূমিতে একটি কবরস্থান ছিল, যাতে অনেক শহীদের কবর ছিল। একে খাজা মিটটী (বা খাজা মীঠী) বলা হত। কবরগুলি খুড়ে তছনছ করে দিল এবং একটি মাটির মূর্তি ঐ স্থানে বসিয়ে দিল। কেউ কেউ বলে, বৈরাগীরা এত শক্তি-ক্ষমতা কোথায় পাবে? এটা ছিল মানসিংয়ের লোকদের কাজ।’ (পৃষ্ঠা : ১৪)
মানসিংহ উপরে উপরে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের প্রতি বিশ্বস্ত হলেও মূলত সে ছিল ইংরেজদের খাস লোক, তাদের ইশারায় সে চলত। উপরের ঘটনা ‘তাওয়ারীখে আওয়াধে’ এভাবে বর্ণিত আছে- ‘বৈরাগীর দল জুতা পায়ে মসজিদে প্রবেশ করল এবং শঙ্খ বাজাল ও হোম করল। বহু ধরনের অসম্মান করল। অদূরে খাজা মীঠীর কবরস্থান ও সাইয়্যেদ সালার রাহ.-এর শহীদানের কবর ছিল। সব তছনছ করে ফেলল। বলাবাহুল্য, বৈরাগীদের এত জনবল ছিল না, কিন্তু শত শত পান্ডা, রাজা মানসিংহের পেয়াদা, রাজা কৃষ্ণদত্ত ও আশপাশের জমিদাররা বৈরাগীদের সাহায্যের জন্য অকুস্থলে উপস্থিত হলে প্রায় দশ বারো হাজার লোক একত্র হয়ে গেল। (খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১১)
এদের মোকাবেলায় মাত্র তিনশ মুসলমান মসজিদের ভিতরে ছিলেন। ইংরেজ রেসিডেন্টের আদেশাধীন বাহিনী নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল। কারণ সবকিছু তো তাদের ইঙ্গিতেই হচ্ছিল।
একটি আশ্চর্য বিষয় এই যে, এই সংঘর্ষের পর বৈরাগীরা হনুমান গাড়িতে কোনো মসজিদ থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল। অথচ ইতিপূর্বে তাদের অভিযোগ ছিল যে, আওরঙ্গযেব ঐখানে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানিয়েছিলেন! ‘তাওয়ারীখে আওয়াধে’র বিবরণ অনুযায়ী হনুমান গাড়ির ঐ মসজিদ অনেক মানুষ নিজের চোখে দেখেছেন বরং অনেকে তাতে নামাযও পড়েছেন। কাযী ইয়ার আলী ইবনুদ্বীনের শত শত বছরের মাহযার কাযী হাবীবুল্লাহর কাছে বিদ্যমান আছে। (প্রাগুক্ত পৃ. ১১২)
এই মসজিদ পুনরুদ্ধারের জন্য পুনরায় মুসলমানরা প্রস্ত্তত হলেন। এবার তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মৌলভী আমীর আলী আমীঠাবী। তাঁদের যুক্তি ছিল, আজ হনুমান গাড়ির মসজিদের বিষয়ে মুসলমানরা আপোস করলে হিন্দুদের দুঃসাহস বেড়ে যাবে এবং লখনৌর একটি মসজিদও নিরাপদ থাকবে না। প্রত্যেক মসজিদে এরা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে। (হাদীকায়ে শুহাদা, পৃ. ১৮)
মৌলভী আমীর আলী আমীঠবী তাঁর ফেদায়ী সাথীদের নিয়ে আগে বাড়লেন। প্রথমে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের সাথে আলোচনা হল। একটি সাক্ষাতের বিবরণ ‘‘হাদীকায়ে শুহাদা’’য় এভাবে দেওয়া হয়েছে-
‘‘নবাব বললেন, ‘আপনি এত তড়িঘড়ি করছেন কেন? আপনার চেয়ে আমাদের চিন্তা কোনো অংশে কম নয়। খোদার কসম, কাফিরদের জুলুম-অত্যাচারে যারপরনাই মর্মাহত। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বড় সাহেবের সাথেও কথা বলার সুযোগ নেই। আল্লাহর কালাম আগুনে পোড়ানোর সংবাদ শুনে কলিজা বিদীর্ণ হয়েছে, কিন্তু আপনার কি মনে নেই শেখ সাদী কী বলেছেন, ‘দের আয়াদ দুরস্ত আয়াদ’ যে কাজ ধীরে সুস্থে করা হয় তা সঠিক হয়। এটা কি ‘উস্তাদের কথা’ নয়? আপনি একটু চিন্তা-ভাবনা করুন এবং কিছুদিন অপেক্ষা করুন। আমরা কৌশলে মসজিদটি উদ্ধার করব এবং দুষ্কৃতিকারীদেরও শাস্তির ব্যবস্থা করব’।’’ (পৃষ্ঠা : ২৫)
এখানে ‘বড় সাহেব’ অর্থ ইংরেজ রেসিডেন্ট। এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, ইংরেজদের ইশারাতেই সব কিছু হচ্ছিল এবং পরিস্থিতির উপর নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এমনকি বড় সাহেবের সাথে তাঁর সাক্ষাতেরও সুযোগ ছিল না।
মৌলভী আমীর আলী নবাবের অসহায়ত্ব বুঝতে পারলেন এবং তার প্রস্তাবকে কালক্ষেপনের বাহানা মনে করে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হলেন। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ‘হাদীকায়ে শুহাদা’ এবং ‘তাওয়ারীখে আওয়াধ’ গ্রন্থে পাওয়া যাবে।
মৌলভী আমীর আলীর লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া, গাদ্দারদের প্রতারণা, সবশেষে ইংরেজ অফিসার বার্লোর কামানের গোলায় তাঁর শাহাদত এই সব কিছুর বিবরণ ঐ দুই কিতাবে পাওয়া যাবে। হাদীকায়ে শুহাদায় আছে যে, ‘বার্লো বাহিনীর মুহুর্মুহু কামানের গোলায় রোয কেয়ামতের অবস্থা সৃষ্টি হল। আসমান-যমীন বিস্ফোরিত হতে লাগল এবং অসহায় মুসলমানদের ব্যাপক হত্যাকান্ডে আসমানের ফেরেশতারা ফরিয়াদ করতে লাগল।
আমীরুল মুজাহিদীন একথা বলতে বলতে শহীদ হলেন-‘ছারে ময়দাঁ কাফন বর দোশ দারম’। (পৃষ্ঠা : ৫৭)
গোনডার তালুকদারও বার্লোর সাথে যোগ দিয়েছিল। ‘‘তাওয়ারীখে আওয়াধ’’ গ্রন্থে বলা হয়েছে-মৌলভী সাহেব তার জায়নামাযের উপর পশ্চিমমুখী হয়ে পড়ে গেলেন। শুরু থেকেই তার দুআ ছিল, আমি যেন কোনো মুসলমানের হাতে নিহত না হই (অর্থাৎ নবাবের কোনো সিপাহীর হাতে)। খোদা তাআলা তার দোয়া কবুল করেছেন। অন্য নামাযীদের লাশও তাঁর চারপার্শ্বে পড়ে রইল। তেলেঙ্গা সেপাইরা বারলুকে সংবাদ দিল, সব মুজাহিদ খতম!
এক তেলেঙ্গি মৌলভী সাহেবের মাথা কেটে আনল। ইংরেজ সেনাপতি যুদ্ধ জয়ের নিদর্শন স্বরূপ তা সরকারের উদ্দেশে পাঠিয়ে দিল। হুজুরে আলা তিরস্কার করে বললেন, কর্তিত মস্তক এখানে কেন এনেছ? তোমরা চাও, লাখনৌতেও হাঙ্গামা সৃষ্টি হোক। হুকুম হল যে, বড় সাহেবকে দেখানোর পর এই মাথা দেহের সাথে মিলিয়ে দাফন করবে। মস্তক বহনকারী সেপাইরা শঙ্কিত হল যে, ফিরতি পথে কোনো মুজাহিদ যদি দেখতে পায় তাহলে তা ছিনিয়ে নিবে এবং আমাদেরকে হত্যা করবে। তাই বড় সাহেবকে দেখানোর পর মস্তকটি কোথাও ফেলে দিল এবং সোজা বারলোর কাছে চলে গেল। (পৃষ্ঠা : ১২৬-১২৭)
দীর্ঘ বিবরণে পাঠক হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, কিন্তু এই প্রেক্ষাপট আপনাকে বাবরি মসজিদ সমস্যার গভীরে পৌঁছতে সাহায্য করবে। এবং বুঝতে কষ্ট হবে না যে, হনুমান গাড়ির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রকৃত বিজয়ী কারা ছিল? নিঃসন্দেহে বিজয়ী পক্ষ হচ্ছে আলেকজান্ডার আর জন হোর্সে, বারলু ও আওয়াধের রেসিডেন্ট জেনারেল অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ। এরাই অযোধ্যায় মসজিদ-মন্দির বিবাদ সৃষ্টি করেছিল এবং ক্ষমতা দখলে সহযোগিতা পাওয়ার জন্য হিন্দুদের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করেছিল। অন্তত অযোধ্যার সংঘর্ষে তো তাদের পক্ষপাত ছিল একদম সুস্পষ্ট।
ইংরেজ ছত্রছায়ায় বৈরাগীরা যখন তিন-চারটি মসজিদ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে তখন বাবরি মসজিদ ধ্বংসে কেন তারা উৎসাহিত হবে না? তারা তো ইতিমধ্যে বাবরি মসজিদে প্রবেশ করে হোমযজ্ঞ করেছে, শঙ্খ বাজিয়েছে এবং মোহন ভোগ খেয়েছে। শুধু বাকি ছিল মসজিদটি গুড়িয়ে দেওয়া এবং সে স্থানে মন্দির নির্মাণ করা। কিন্তু শত পশ্চাৎপদতা ও ব্যাপক গণহত্যার শিকার হয়েও অযোধ্যার মুসলমানরা ঈমানী তেজ ও জাতীয় চেতনাকে বক্ষে ধারণ করে রেখেছিলেন। চরম পর্যুদস্ত অবস্থাতেও তারা বৈরাগীদের মসজিদ থেকে তাড়িয়েছেন এবং মসজিদটি রক্ষায় যুক্তি-প্রমাণ এবং ধর্ম ও আইন সকল দিক থেকে হিন্দুদের সাথে অবিরাম লড়াই করেছেন। আগামী আলোচনায় পাঠক তা দেখতে পাবেন।
ইংরেজ যথারীতি হিন্দুদের পক্ষপাতিত্ব করেছে এবং তাদেরকে উসকানি দিয়েছে, কিন্তু রাম-জন্মস্থান ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণের সমসাময়িক ও নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল তারা যোগার করতে পারেনি। এজন্য মুসলমানদের উচ্ছেদ করে মসজিদের জমি হিন্দুদের অধিকারে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবু তারা অবিরাম প্রচারণা করেছে যে, এই মসজিদ ‘জন্মস্থান’ ধ্বংস করেই নির্মিত। তাদের প্রস্ত্ততকৃত গেজেটিয়ারেও এসব কথা থাকত, কিন্তু (উদ্ধৃতির অভাবে) সেসব ভাষ্য-বক্তব্য গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
ইংরেজ হুকুমত পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনায় বৈরাগীরা কখনো মসজিদে ঢুকে পড়ত, মূর্তি স্থাপন করত, এমনকি পূজা-পাঠও করত, কিন্তু আদালতের মামলায় কখনো তারা জয়লাভ করতে পারেনি। সামনের আলোচনায় পাঠক তা দেখতে পাবেন।
এই সব প্ররোচনার পিছনে ইংরেজদের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিবাদটি জিইয়ে রাখা এবং ভারতবর্ষের প্রধান দুটি জাতিকে এর মাঝেই লিপ্ত রাখা। বস্তুত উভয় জাতির ধর্মীয় আবেগ পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের রাজ্যক্ষমতাই নিষ্কন্টক করতে চেয়েছিল।
আরেকটি বিবাদ হয়েছিল মসজিদের দেয়াল ও ফটক নিয়ে। এ বিষয়ে আদালতে যে আর্জি পেশ করা হয় তা এই-
محمد اصغر 1870 ء رگهوبير منعقدہ جنورى 1884 ء محمد اصغر خطيب وموذن مسجد بابرى واقع جنم استهان اوده
در جواب صدور حكم جائے دروازہ متعلق سائل ... تيار كيا ہے تو اس كا ... سائل ... نا منظورى ديديا جائے ... دروازہ سے متعلق نہيں ہے.
عادل زمان، غريب پردرسلامت ... مسجد بابرى واقع جنم استهان اوده ميں حكم ... دروازہ جديد جانب اتر ... تيار ہو رہا ہے ... ديوار اس كى شكست كروا دى گئى ہے، اب بہ نظر چالاكى كے ... دكهن منھ چبوترہ واسطے قائم كرنے ملكيت اسى ديوار مسجد كى طرح تيار كى ... پاس ہے، ... منصب خاندانى سائل ... خلاف عمل در آمد قائم ہوئى ہے، كيونكہ لكهيم واس مہنت وديگر مہنتان ما سبق كو سوائے چبوترہ كے دوسرے ميں مداخلت نہين ہے، ديوار احاطہ مسجد كى ہے، كچه چبوترہ كى نہيں ہے، اس ميں اكثر احكام عدالت ہيں كہ كوئى امر جديد نہ ہو نے پائے، اس صورت ميں مدعى عليہ كو حكم ہو وے كہ وہ كنارہ كش دروازہ كے ہو ويں، وسائل كو اجازت موجود ہووے كہ دروازہ وكنجى دروازہ پاس سائل كے رہے كہ وقت كثرت ميلہ آمد ورفت دروازہ كهول ديا كريں واگر ضرورت جانيں تو سائل سے دلوايا جائے ورنہ ... سے ديا جائے، تاكہ باعث رفع تكرار كا ہو جائے، ليكن كنجى متعلق سائل سے رہے، مہنت سے نہ رہے، واجب جان كر عرض كيا،
فدوى سيد محمد اصغر، خطيب ومتولى مسجد بابرى واقع اوده، مورخہ 3 اپريل 1877ء
আলোচনা : এই আর্জি থেকে বোঝা যায়, মোহান্তরা চেষ্টা করছিল, মসজিদের একটি দেয়াল ভেঙ্গে তাদের দেয়াল নির্মাণ করবে এবং তাতে একটি দরজা রাখবে। কারণ মেলার সময় পূর্বদিক থেকে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে হাঙ্গামার আশঙ্কা ছিল। তাই মসজিদের উত্তর দিকে দরজা বানানোর পরিকল্পনা তাদের ছিল। আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল, বেদিটি মোহান্তদের মালিকানায় নিয়ে আসা। মসজিদের খতীব ও মুয়াজ্জিনের পক্ষ থেকে আবেদন করা হল, ‘দেয়ালটি মসজিদের, এতে মোহান্তদের কোনো অধিকার নেই।’ তারা চেষ্টা করলেন, যেন দরজা মসজিদের থাকে এবং এর চাবিও মসজিদের খতিবের কাছে সংরক্ষিত থাকে। মেলার সময় তিনি দরজা খুলে দিবেন যাতে কোনোরূপ ঝগড়া-বিবাদ না হয়। এই মোকদ্দমার কী ফয়সালা হয়েছিল তা পাওয়া যায়নি। আবেদনটি সম্ভবত ১৮৭০ সালের।
এভাবে হিন্দু-মুসলিমের মাঝে মামলা-মোকদ্দমার এক অন্তহীন ধারা চলতে থাকে। ইতিমধ্যে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজ্য-ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়েছে। এখন হিন্দু-মুসলিম সংঘাতকে আরো স্থায়ী ও প্রলম্বিত করার সকল উপায়-উপকরণ তাদের হাতে।
ইতিমধ্যে অযোধ্যায় মসজিদ-মন্দির বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এর ফলে হিন্দু-মুসলমানের মাঝে বিভেদ-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছিল। এখন তাদের প্রয়োজন ছিল বাবরি মসজিদ বনাম রাম জন্মস্থানের বিবাদ আরো জোরদার করা। এ পর্যন্ত জন্মস্থান ধ্বংসের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ কেউই উপস্থিত করতে পারেনি, না হিন্দু, না ইংরেজ। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠি কিছু লিখিত দলীলের তাগিদ অনুভব করল।
পি. কার্নেগির রিপোর্ট ১৮৭০ ঈ.
১৮৭০ সালে যখন ফয়েজাবাদ তহশিলের বন্দোবস্ত হচ্ছিল তখন এর সেটেলম্যান্ট অফিসার ও ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কমিশনার পি. কার্নেগি একটি রিপোর্ট প্রস্ত্তত করেন, যার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হল।
‘স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করানো হয়, মুসলিম-অভিযানের সময় এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ছিল : জন্মস্থান, স্বর্গদুয়ার মন্দির ও ত্রেতার ঠাকুর। জন্মস্থান হচ্ছে ঐ জায়গা, যেখানে রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন, স্বর্গদুয়ার হচ্ছে ঐ ফটক, যা দিয়ে তিনি বৈকুণ্ঠ গমন করেন, এটি ঐ জায়গাও হতে পারে যেখানে তাকে দাহ করা হয়। (স্বর্গদুয়ারকে রাম দরবারও বলা হয়।) আর ত্রেতার ঠাকুর হচ্ছে যে স্থানে রামচন্দ্র নৈবেদ্য দিয়েছিলেন। এরই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তিনি এখানে স্থাপন করেছিলেন নিজের তিনটি ও সীতার একটি মূতি।
বাবরের রোযনামচার লিডনের সংস্করণে আছে, সম্রাট বাবর ২৮ মার্চ ১৫২৮ খৃ. অযোধ্যা থেকে দুই বা তিন ক্রোশ দূরে সরজু ও ঘাগরা নদের সঙ্গমস্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি এখানে একটি শিকারগাহের কথা বলেছেন, যা আওয়াধ থেকে সাত-আট ক্রোশ দূরে সরজু নদীর তীরে অবস্থিত। মনে রাখা দরকার, বাবরের রোযনামচার কোনো সংস্করণেই তাঁর অযোধ্যা-আগমনের কথা নেই। রোযনামচার ঐ পৃষ্ঠাগুলো পাওয়া যায় না।
বাবরি মসজিদের দুই জায়গায় পাথরের ফলকে নির্মাণের তারিখ খোদিত আছে-৯২৫ হিজরী মোতাবেক ১৫২৮ ঈ.। তাতে বাবরের শান-শওকতের কথা বলা হয়েছে।
হনুমানগাড়ির কয়েকশ কদম দূরে জন্মস্থান অবস্থিত। ১৮৫৫ সালে হিন্দু-মুসলমানের মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। হিন্দুরা জোরপূর্বক হনুমানগাড়ি কব্জা করে। আর মুসলমান অধিকার করে জন্মস্থান। মুসলমানরা হনুমানগাড়ির সিড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সাথে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়। হিন্দুরা সফলভাবে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে থাকে এবং তৃতীয় প্রচেষ্টায় তারা জন্মস্থান উদ্ধার করে। ফটকের সামনে পঁচাত্তর জন মুসলমান নিহত হয়। তাদেরকে ‘গঞ্জে শহীদাঁ’তে সমাহিত করা হয়। বাদশাহর একাধিক বাহিনী ছিল এই ঘটনার নীরব দর্শক। তাদের উপর হুকুম ছিল কোনোরূপ হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার।
লোকে বলে, এ যাবৎ হিন্দু-মুসলমান ঐ মসজিদ-মন্দিরে ইবাদত ও পূজা করে আসছিল। বৃটিশ আমলে মাঝে বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়। যাতে ঝগড়া-বিবাদ না হয়-মসজিদে মুসলমানরা নামায পড়ে এবং হিন্দুরা বেড়ার বাইরে তাদের চবুতরায় পূজা করে।
(ইংরেজি উদ্ধৃতি থেকে তরজমা; মুসলিম ইন্ডিয়া ইংরেজি, মার্চ ১৯৮৬, পৃষ্ঠা : ১১৯)
আলোচনা : এই উদ্ধৃতিটির পর্যালোচনা একটু সতর্কতার সাথে করতে হবে। কারণ পরে ফয়েজাবাদের নতুন গেজেটিয়ারগুলোতেও এরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।
শুরুতে বলা হয়েছে-‘স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করানো হয় যে, মুসলিম-অভিযানের সময় এখানে বিশেষ তিনটি মন্দির ছিল, যেগুলোতে অল্প ক’জন পূজারী বসবাস করত। অযোধ্যা তখন বিরাণ হয়ে গিয়েছিল।’
এ কথাগুলোর সূত্র জনশ্রুতি, একজন ঐতিহাসিকের কাছে যার কোনো মূল্য নেই। এ ধরনের বর্ণনা যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে বর্জনও করা যায়। কারণ এ জাতীয় বর্ণনার যথার্থতা নিশ্চিত নয়। তাছাড়া বলা হয়েছে, ‘অযোধ্যা তখন বিরাণ হয়ে গিয়েছিল। সামান্য কিছু পূজারী সেখানে বসবাস করত।’ এ থেকে বোঝা যায়, সে সময়ের অযোধ্যা তীর্থভূমির পর্যায়ে ছিল না। ফলে তা বিরাণ হয়ে পড়েছিল। তা ছিল অল্প কিছু পূজারীর আবাস। এহেন বিরাণ ভূমির কোথাও যদি একটি মসজিদ নির্মিত হয় তাতে কী অপরাধ হয়ে গেল?
এরপর জন্মস্থান, স্বর্গদুয়ার ও ত্রেতার ঠাকুরের কথা বলা হয়েছে। এগুলোরও সূত্র জনশ্রুতি।
এরপর বলা হয়েছে বাবরের আওয়াধ আগমনের কথা। এখানে স্বীকার করতে হয়েছে যে, বাবরের রোযনামচায় অযোধ্যা আগমনের কথা নেই। তিনি যখন অযোধ্যায়ই আসেননি তখন তাঁর মসজিদ নির্মাণেরও প্রশ্ন আসে না। কিন্তু এ তথ্যটিকে এ কথা বলা অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, রোযনামচার ঐ পৃষ্ঠাগুলো পাওয়া যায় না, যাতে বাবরের অযোধ্যা আগমনের উল্লেখ থাকতে পারে।
এ জাতীয় অনুমান একজন ঐতিহাসিকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ শুধু বিবাদে ইন্ধন দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। উপরের উদ্ধৃতিতে কোথাও রামজন্মভূমি ধ্বংসের কথা নেই, তবে ইশারা-ইঙ্গিতে সে ধারণাই দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি। কারণ এর সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
যখন এ কথা লেখা হল যে, এই মসজিদ তার ফলক-লিপির বিবরণ অনুযায়ী ১৫২৮সালে নির্মিত এবং তাতে বাবরের কথাও বলা হয়েছে তখন এ কথা স্বীকার করে নিতে দ্বিধার কী কারণ থাকতে পারে যে, এটি বাবরের আমলেই নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এটা স্বীকার করে নিলে বিবাদ কীভাবে জিইয়ে রাখা যাবে?
পি. কার্নেগির রিপোর্টে ১৮৫৫র রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা আছে। কিন্তু সংঘর্ষের মূল কারণ বলা হয়নি। মনে হতে পারে, এই সংঘর্ষ বাবরি মসজিদের কারণে হয়েছিল, কিন্তু ইতিপূর্বে বলা হয়েছে, সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল হনুমানগাড়ির একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে, যা হিন্দুরা ধ্বংস করে দিয়েছিল।
ঐ সংঘর্ষের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রথমে হিন্দুরা জোরপূর্বক হনুমানগাড়ি কব্জা করে’-এ তথ্য সঠিক, কিন্তু এরপর লেখা হল, ‘মুসলমানরা জন্মভূমি অধিকার করে।’ এ থেকে মনে হতে পারে, ঐ সময় পর্যন্ত জন্মভূমি বিদ্যমান ছিল এবং মুসলমানরা তা অধিকার করেছিল। অথচ এখানে জন্মভূমি বলে বাবরি মসজিদকেই নির্দেশ করা হয়েছে। আগেও বলা হয়েছে, ঐ সংঘর্ষে বাবরি মসজিদের ফটকের সামনেই পঁচাত্তর জন মুসলমান লড়াই করে শহীদ হন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাবরি মসজিদ না বলে জন্মভূমি কেন বলা হল? শুধু হিন্দুদেরকে বিশ্বাস করানোর জন্য যে, মসজিদটি রামজন্মভূমির উপরই নির্মিত! বিবাদে উসকানী দেওয়া ছাড়া এর আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে?
আরো বলা হয়েছে, বাদশাহর বাহিনী ছিল এই ঘটনার নীরব দর্শক, তাদের উপর হুকুম ছিল কোনোরূপ হস্তক্ষেপ না করার।’ বাদশাহ অর্থ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ। এই অসত্য তথ্য পরিবেশনের উদ্দেশ্য ইংরেজ কমান্ডার বারলোর নির্বিচার গুলিবর্ষণকে ধামাচাপা দেওয়া। এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ইতিপূর্বে দেওয়া হয়েছে।
আর এ তো নির্জলা মিথ্যা যে, ‘কথিত আছে, এ যাবৎ হিন্দু-মুসলমান ঐ মসজিদ-মন্দিরে ইবাদত ও পূজা করত।’ কোনো মুসলমান কি মেনে নিতে পারে যে, একই জায়গায় মূর্তিপূজাও হবে, নামাযও পড়া হবে। আর আগে থেকেই যদি এই রীতি চলে আসবে তাহলে হিন্দু-মুসলমানের বিবাদই কেন হল আর তা মীমাংসার জন্য বৃটিশ আমলে বেড়াই বা কেন দিতে হল?
উপরন্তু হিন্দুরা কীভাবে মেনে নিল যে, আজ থেকে বাবরি মসজিদে শুধু নামাযই পড়া হবে, পূজা করা যাবে না? পূজা হবে মসজিদের বাইরে!! এই মিথ্যাচারেরও উদ্দেশ্য হিন্দুদের উসকানী দেওয়া।
এই তথ্যও সঠিক নয় যে, মসজিদ ও চবুতরার মাঝে বৃটিশ শাসনামলে দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। ‘কায়সারুত তাওয়ারীখে’র লেখক বলছেন, নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ-ই সর্বপ্রথম মসজিদ ও চবুতরার মাঝে জংলা দিয়ে দুটোকে আলাদা করে দিয়েছিলেন, যা ১৮৫৫ সালে বৈরাগীরা ভেঙ্গে ফেলে। (খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১১২)
এটা ভিন্ন কথা যে, পরে আবার এখানে দেয়াল তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
আলেকজান্ডার কেনিংহামের রিপোর্ট প্রথম খন্ড ১৮৭১ ঈ.
১৮৫৭ সালের পর কোম্পানির রাজত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। নিজেদের কায়েমী স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তারা অন্য অনেক কাজের মতো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করল এবং বই-পুস্তক লেখানো শুরু করল। এসময়ই প্রত্যেক জেলার গেজেটিয়ার প্রস্ত্তত করা হয়। আপাত দৃষ্টিতে উপকারী মনে হলেও যে বিষ এ সকল রচনার ছত্রে ছত্রে ভরে দেওয়া হল তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে রইল।
আলেকজান্ডার কেনিংহামকে মনে করা হয় ভারতবর্ষের প্রত্নতত্ত্বের অনেক বড় বিশেষজ্ঞ। ইতিহাস ও গবেষণাকর্মে এখনো তার রিপোর্টগুলো অপরিহার্য। তার রিপোর্টের প্রথম খন্ডে ১৮৭১ সালে ‘অযোধ্যা’ সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন আজ পর্যন্ত এই শহরের উপর এর চেয়ে উত্তম কোনো গবেষণা প্রকাশিত হয়নি। এখানে তার কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।
‘এখানে বলে দিচ্ছি যে, আমি হিন্দুদের আরেকটি তীর্থ স্থান সম্পর্কে শুনেছি, যা গোমতীর তীরে অবস্থিত এবং ‘সিতবারা’ নামে পরিচিত। সুলতানপুর থেকে লাখনৌর দিকে পনেরো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে বছরে দুটি মেলা হয়ে থাকে। প্রথমটি চৈত্রের নয় তারিখে যখন চাঁদ বাড়তে থাকে, দ্বিতীয়টি কার্তিকের পনেরো তারিখে, যখন চাঁদ পূর্ণ হয়ে যায়। বলা হয়, পঞ্চাশ হাজার লোক একত্র হয়ে এখানে স্নান করে। প্রথম মেলাকে বলে রাম নবমী তীর্থ। ‘সিতবারা’ নামের মূল আমি খুঁজে পাইনি।’
এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘বুদ্ধ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ এখানে দুই জায়গায় অবস্থান করেছেন। সরস্বতী তিনি নয় বা উনিশ বছর ছিলেন।
চীনা পর্যটক হিউন সাং এর বিবরণে আছে, তিনি বিশাখাতে ছয় বছর ছিলেন। এটা সরস্বতীর দক্ষিণে কিছু দূরে অবস্থিত। আমার মতে, বিশাখা ও ছাকেত একই জায়গার নাম।’
এরপর কেনিংহাম ‘অযোধ্যা’র আলোচনা এভাবে করেন-‘বর্তমান অযোধ্যা প্রাচীন নগরীর উত্তর পূর্বে অবস্থিত। এটি দৈর্ঘ্যে দুই মাইল এবং প্রস্থে পৌনে এক মাইল। তবে অর্ধেক শহর বসতিশূন্য। গোটা শহরে জীর্ণতার ছাপ পরিস্ফুট। অন্যান্য বিরান নগরে যেমন দেখা যায়, ধ্বংসাবশেষের টিলা, ভগ্ন, অর্ধ ভগ্নমূর্তি, কারুকাজ করা খুঁটি-এগুলো এখানে পাওয়া যায় না। ময়লা-আবর্জনার স্ত্তপ আছে, যা থেকে ইট-পাথর বের করে পার্শ্ববর্তী শহর ফয়েজাবাদের ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে। মুসলমানদের এই শহরটি আড়াই মাইল দীর্ঘ এবং এক মাইল চওড়া। এই শহরটি ঐসব ইট-পাথর দ্বারা নির্মিত, যা অযোধ্যায় খনন করে পাওয়া গেছে। শহর দুটি ছয় বর্গমাইল এলাকার মাঝে অবস্থিত। এটা সম্ভবত রামের প্রাচীন রাজধানী অযোধ্যার অর্ধেক। ফয়েজাবাদে শুধু ‘বউবেগমে’র মাকবারা পরিষ্কার দেখা যায়। ওয়ারেন হেস্টিংসের মোকদ্দমার প্রসঙ্গে এই বেগমের কথা এসেছে। ফয়েজাবাদ ছিল প্রথম দিকের নবাবদের রাজধানী। আসফউদ্দৌলার আমলে তা বিরান হয়ে যায়।’
কিছু দূর গিয়ে কেনিংহাম লেখেন, ‘রামায়নের বিবরণ অনুযায়ী, অযোধ্যা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন মনু। তাকে মানবজাতির আদিপিতা মনে করা হয়। এক সময় এখানে দুর্গবেষ্টিত নগরী ছিল। ফটক ছিল। চারপাশে পরিখা ছিল। কিন্তু এখন সেসবের নাম-নিশানাও দেখা যায় না। বলা হয়ে থাকে, রামের অযোধ্যা খৃষ্টপূর্ব ১৪২৬ সালেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিক্রমাদিত্যের আমল পর্যন্ত তা ছিল বিরান নগরী। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী বিক্রমাদিত্য ছিল উজ্জয়িনীর একজন শিকারী রাজা। এ যুগের হিন্দুরা বিক্রমের সকল কার্যকলাপ তার সাথেই যুক্ত করে থাকে। তাদের এই ধারণা ভিত্তিহীন। হিউন সাংয়ের বিবরণ অনুযায়ী এ নামের একজন শক্তিশালী রাজা সরস্বতীর নিকটে কনিষ্কর একশ বছর পরে অতিবাহিত হয়েছেন। সম্ভবত সময়টি ছিল খৃষ্টপূর্ব ৭৮ সাল। ...
এই বিক্রমাদিত্য সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ছিলেন বৌদ্ধ-বিদ্বেষী একজন উদ্যমী ব্রাহ্মণ। আমার মতে তিনিই অযোধ্যা নগরী পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছেন। রামচন্দ্রের ইতিহাসে যে পবিত্র স্থান তার নামের সাথে যুক্ত তা সন্ধান করিয়েছেন। বর্ণিত আছে, তিনি যখন এখানে আসেন তখন অযোধ্যা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে বন-জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল।
তিনি রামচন্দ্রের প্রসিদ্ধ স্থানের খোঁজ বের করেন। সরযূ নদীর ঘাট থেকে মাপা আরম্ভ করেন। লোকে বলে, তিনি রামচন্দ্র, সীতা, লক্ষণ, শত্রুঘ্ন, হনুমান ও অন্যান্যের নামে তিনশ ষাটটি মন্দির নির্মাণ করেছিল। ...
কিছু আগে গিয়ে কেনিংহাম লেখেন-
অযোধ্যায় ব্রাহ্মণদের মন্দির আছে, তবে সেগুলো সাম্প্রতিক কালের এবং সেগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্য নেই। নিঃসন্দেহে এ সকল মন্দিরের অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে মুসলমানদের ধ্বংস করে দেওয়া প্রাচীন মন্দিরগুলোর স্থানে।
নগরীর পূর্ব দিকে রামকোটের হনুমানগাড়ি অবিস্থত। এটি একটি ছোট দূর্গ, যা দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত। চৌহদ্দির ভিতর একটি নতুন মন্দির আছে, যা টিলার উপর অবস্থিত। রামকোট নিঃসন্দেহে অতি প্রাচীন স্থান। এর সম্পর্ক মুনি পর্বতের সাথে। হনুমান মন্দির বেশি পুরোনো নয়। এটা আওরঙ্গযেবের আমলের আগের নয়। নগরীর পূর্ব কোণে রামঘাট অবস্থিত। কথিত আছে, রামচন্দ্র এখানে স্নান করেছিলেন। স্বর্গদুয়ারী বা স্বর্গদুয়ার হচ্ছে স্বর্গের দ্বার। উত্তর পূর্বে ঐ স্থানটি নির্দেশ করা হয়, যেখানে রামচন্দ্রের দাহ হয়েছিল। কয়েক বছর আগে এখানে একটি বৃক্ষ ছিল, যাকে বলা হয় ‘অশোক বট’। অর্থাৎ এটি হচ্ছে ঐ বৃক্ষ, যার নিকটে দুঃখ-শোক হয় না। সম্ভবত স্বর্গের সাথে মিলিয়ে এ নাম রাখা হয়েছে।
লোকের বিশ্বাস, এখানে যারা মৃত্যুবরণ করে কিংবা এখানে যাদের দাহ হয় তারা পুনর্জন্ম থেকে মুক্তিলাভ করে। অদূরে লক্ষণ-ঘাট অবস্থিত, যেখানে রামচন্দ্রের ভাই লক্ষণ স্নান করেছিলেন। এখান থেকে পোয়া মাইল দূরে নগরীর কেন্দ্রে জন্মস্থানের মন্দির দাড়িয়ে আছে। এখানে রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমে পাঁচ মাইল দূরে গুপ্তের ঘাট। এখানে কয়েকটি শ্বেত মন্দির রয়েছে। লোকে বলে, এখান থেকেই লক্ষণ অন্তর্হিত হয়েছিলেন। এ কারণেই এর নাম গুপ্তের ঘাট। কেউ কেউ বলে, এখান থেকে লক্ষণ নয়, রাম অন্তর্হিত হয়েছিল। তবে স্বর্গদুয়ারে তার শবদাহের বর্ণনার সাথে এই মতকে মেলানো যায় না। ’’
কেনিংহাম আরো লেখেন-
‘প্রাচীন নগরে বিশটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল, যাতে তিনহাজার ভীক্ষু বসবাস করত। সাথেই ছিল ব্রাহ্মণদের পঞ্চাশটি মন্দির। ব্রাহ্মণদের বসতিও ছিল অনেক বড়। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সপ্তম শতকের প্রথম দিকে বিক্রমাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত তিন শ মন্দির ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং অযোধ্যা বিরান হতে চলেছিল।’
আলোচনা : আলেকজান্ডার কেনিংহামের এই উদ্ধৃতিগুলো থেকে জানা যায়, অযোধ্যা খৃষ্টপূর্ব ১৪২৬ সালের পর সম্পূর্ণ বিরান হয়ে গিয়েছিল এবং বন-জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল। কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। সকল নিদর্শন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রায় দেড় হাজার বছর পর নিছক অনুমানের ভিত্তিতে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সেখানে তিনশ ষাটটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে তিন শ মন্দির মুসলমানদের আগমনের আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেনিংহাম যখন এ গ্রন্থ রচনা করেছেন, অর্থাৎ ১৮৭১ সালে, তখন তিনি অযোধ্যা সম্পর্কে লিখেছেন, এই শহরের অর্ধেক এলাকাও বসতি নেই, গোটা শহরে জীর্ণতার ছাপ পরিস্ফুট, অন্যান্য বিরান নগরীতে যেমন পাওয়া যায়-ধ্বংসাবশেষের উঁচু উঁচু টিলা, ভগ্ন, অর্ধভগ্ন মূর্তি, কারুকাজ করা খুঁটি-এগুলো এখানে পাওয়া যায় না।
তিনি দেখাতে চান, তার সময় পর্যন্ত পবিত্রভূমি হিসেবে অযোধ্যার কোনো গুরুত্ব ছিল না। এরপর এ কথা লিখে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধদের উত্তেজিত করছেন যে, এ নগরীর পুনর্প্রতিষ্ঠার পিছনে বিক্রমাদিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধদেরকে উচ্ছেদ করা।
এরপর মুসলমানদের উপর অপবাদ আরোপ করলেন যে, অযোধ্যায় সাম্প্রতিক কালের যে মন্দিরগুলো আছে, সেগুলোর অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে মুসলমানদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন মন্দিরসমূহের স্থানে!


এই তথ্যের সপক্ষে তিনি কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করেননি। তবে তিনিও দাবি করেননি যে, রাম জন্মভূমির মন্দির ধ্বংস করে বাবর একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন, যা বাবরী মসজিদ নামে পরিচিত। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি লিখছেন, লক্ষণঘাট থেকে পোয়া মাইল দূরে শহরের কেন্দ্রে জন্মস্থানের মন্দির দাড়িয়ে আছে। যদি কেনিংহামের সময় পর্যন্ত এই মন্দির অক্ষত থাকে তাহলে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়, বাবরি মসজদি ঐ মন্দির ভেঙ্গেই বানানো হয়েছে?! তবে কি হিন্দু-মুসলিমে যে দীর্ঘ মামলা-মোকদ্দমা তা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল? রামমন্দিরের প্রসঙ্গ ছিল বাহানামাত্র?

সংগ্রহে- সুহাইল আমীন
Powered by Blogger.