Header Ads

নাগরিক তালিকা তৈরি নিয়ে ভারতের আসাম রাজ্য জুড়ে হিন্দু-মুসলিম চরম উত্তেজনা

 ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য আসামের ৫০ লক্ষ মুসলমানকে জাতীয় নাগরিক পত্রের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত প্রায় চূড়ান্ত। ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের ভারতের বাইরে ঠেলে পাঠানো হবে, এমন আশংকার কথা শুনিয়েছেন অনেকেই। আসামকে আসলে মিয়ানমারে পরিণত করার কৌশল ফেঁদেছে বিজেপি সরকার। তাই ২০১৪ সাল অবধি আগত হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে, কিন্তু মুসলমানদের বাংলাদেশি বানিয়ে বাইরে পাঠানো হবে। কিন্তু ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা হলে ৫০ লক্ষ মুসলমানও বসে থাকবে না। এর পরিণামে হত্যা-হিংসা, মারামারি, খুনোখুনি হবে, রক্ত ঝরবে আসামে। আর এটাকে উপলক্ষ্য করে রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো নতুন আরেক আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়াতে পারে।

নতুন দিল্লিতে গত ১৩ নভেম্বর সোমবার ভারতের ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি আল্লামা আরশাদ মাদানী। অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম নামের এক সংগঠনের আয়োজনে এই সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, আসামের বুদ্ধিজীবি, চিন্তাবিদ ড. হীরেন গোঁহাই, অধ্যাপক অপূর্ব বরুয়া, আব্দুল মান্নান, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ হাফিজ রশিদ আহমদ চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক হায়দর হুসেন, মনজিৎ মহন্ত প্রমুখ।






আল্লামা আরশাদ মাদানী
সম্মেলনে আল্লামা আরশাদ মাদানী বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। যারা ভারতীয় নয়, তাদের আমরা ভারতীয় বানাতে চাই না। যারা ভারতীয় নয়, তাদের বাইরে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু যাদের পুর্বপুরুষ ৪০০ বছর ধরে আসামে বসবাস করছেন, তাদের বাংলাদেশি বানিয়ে বাইরে ঠেলে পাঠাবেন, এর অনুমতি দেব না আমরা। কিন্তু আসামের বিজেপি সরকার সেটাই করতে চাচ্ছে।

আদালতে পঞ্চায়েত-নথির বৈধতা খারিজের আড়ালেও ষড়যন্ত্র রয়েছে উল্লেখ করে মাদানী বলেন, ৪০০ বছর ধরে আসামে বসবাসকারী মুসলমানদের বাংলাদেশী বানাতেই পঞ্চায়েত-নথি মানা হচ্ছে না। এতে আপত্তি রইলে এতদিন অবধি পঞ্চায়েত নথি যারা জমা দিয়েছেন, তাদের মেনে নেওয়া উচিত ছিল সরকারের। এখন থেকে আর গ্রহণ করব না বললে আমরাও আপত্তি করতাম না। কিন্তু এখন ৫০ বছর বয়সী সব মহিলাকে বলবেন ভারতীয় নয়, তাহলে তো বিশাল ঘটনা ঘটে যাবে। তারা কী মরে যাবে? তাদের গলা টিপে দিন। তাদের বাপ-দাদা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছেন। কিন্তু এখন তাদের ছেলে-মেয়েদেরই বলা হচ্ছে, তারা ভারতীয় নয়। এখন তাদের বাইরে ফেলে দেওয়া হবে। আসামে বিজেপি সরকার সেই কৌশল নিয়েছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লোকেরা যেভাবে রাষ্ট্রচালিত হিংসার শিকার হচ্ছেন। আসামের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই নিয়তি অপেক্ষা করে রয়েছে বলে মনে করেন মাদানী। তার মন্তব্য ‘২০১৪ সাল অবধি যেসব হিন্দু আসামে এসেছেন, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অথচ চারশো বছর ধরে বসবাসকারী মুসলমানদের বাংলাদেশী বানানো হবে। এখন বলা হচ্ছে, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত কর। ভোটাধিকার যখন কেড়ে নেওয়া হবে, তখন দশ বছর পর বলা হবে তোমরা ভারতীয় নও। মায়ানমারে যা হয়েছে, তখন আটকাবে কে? আসামকে আসলে মিয়ানমার বানানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। সেই অভিপ্রায় নিয়ে এগুচ্ছে বিজেপি সরকার।

একই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ড. হীরেন গোঁহাই। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নাগরিক তালিকাকে ঘিরে সরকারের নানা মন্তব্য, অবস্থানে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আসামে। ভয় করেছি আমরা সেটা হতে পারে। তাই আমরা এখানকার সচেতন লোকদের কাছে এসেছি। এখানে যুক্তিবাদী. দেশপ্রেমী লোক রয়েছেন; তাদের বলেছি, এই বিষয়টি আসলে ভারতে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে আল্লামা আরশাদ মাদানীর উপরোক্ত মন্তব্যকে ঘিরে আসামের শাসক দলের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তোপের মুখে পড়েছেন জামিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের প্রবীণ নেতা মাদানী।

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আসামে একের পর এক এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে, আসাম পুলিশও তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে উদ্যোগ নিয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন, যারাই এই তালিকা প্রকাশের বিরোধিতা করবেন আসামে তাদের ‘শত্রু’ বলে গণ্য করা হবে।

আসামের বিভিন্ন প্রান্তে অসমিয়া ও হিন্দু সংগঠনগুলি এর পরই আল্লামা মাদানীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে দেয়, তার কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হতে থাকে।

রাজ্যে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় দল এআইডিইউএফ-এর দাবি, আল্লামা মাদানীর বক্তব্যকে বিকৃত করা হচ্ছে। দলের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের কথায়, “আরশাদ মাদানীর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমার সন্দেহ, উর্দুতে দেওয়া তার বক্তব্য মিডিয়ার সবাই বোঝেনি, তিনি কিন্তু শান্তি বজায় রাখার কথাই বলেছিলেন। উনি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেটা অনেকে বুঝতে পারেনি।”

এনআরসি তালিকা প্রকাশের আগে আসামের পরিবেশ যে কতটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে আছে, সম্ভবতঃ এই সব কথাবার্তা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তার প্রমাণ।

জামিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের নেতা আল্লামা আরশাদ মাদানীর বক্তব্যে বিজেপি যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তাতে টগবগ করে ফুটছে গোটা রাজ্য।
Powered by Blogger.