Header Ads

ইংরেজ বেনিয়াদের হীন চক্রান্ত ও আমীরুল হিন্দ হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) এর ঐতিহাসিক ফতোয়া ।

রুহুল আমীন(সুহাইল আমীন)-ইংরেজ বেনিয়াদের হীন চক্রান্ত ও আমীরুল হিন্দ হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) এর ঐতিহাসিক ফতোয়া । 
( ১৭৪৬-১৮২৩ ঈসায়ী )
১৭৩৯ ইংরেজী সনের কথা, যখন ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের দুঃশাসন জাতীর কাঁধে চেপে বসেছিল । তখন শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রাহঃ) এর ঘরে জন্ম নেন এক সৌভাগ্যবান সাহসী সন্তান । যার ললাটে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আলোকচ্ছটা । ক্ষণজন্মা এই শিশু শৈশবেই পবিত্র কোরআন শরীফ মুখস্ত করেন । এরপর মাত্র তেরো বছর বয়সে, নাহু, সরফ, মান্তিক, আকাঈদ সহ পাঠ্যসূচীর সকল কিতাব অধ্যায়ন সমাপ্ত করেন । তার এই অভূতপূর্ব প্রতিভা বিচক্ষণ লোকদের রীতিমত তাক লাগিয়ে দেয় । ইতিহাসের সুনিপন, দক্ষ, বিচক্ষণ ও সাহসী এই সন্তান ছিলেন, শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) । শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) তাঁর পিতার অপিরিসীম স্নেহ, সুচারু তত্বাবধান এবং ঐকান্তিক সুনজরে থেকেই, তালীম ও তারবিয়্যাতের ধাপগুলো অতিক্রম করেন ।
এরপর শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) হাদীসের উচ্ছতর জ্ঞান লাভের জন্য পিতার দারসে অংশগ্রহণ শুরু করেন । এভাবে ইলমে হাদীসের জগতে বিরাট বুৎপত্তি অর্জন করেন । বর্তমানে গোটা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের সকল আলিমদের হাদীসের সনদ তাঁকে কেন্দ্রকরে এক হয়ে যায় । কিছুদিন পর তিনিই দারসে হাদীসের মাসনদে বসেন, শুরু করেন দারসে হাদীস । এদিকে তাঁর অসাধারণ মেধাশক্তির প্রসিদ্ধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে । তাঁর সূক্ষ্মদর্শিতা, সুক্ষচিন্তা, যথার্থ প্রমান উপস্তাপনা, এবং ইলিম ও জ্ঞানের পরিপক্ষতা ক্রমান্বয়ে তাঁকে উজ্জলতর করতে থাকে । তখন গোটা ছাত্র সমাজ তাঁর স্বভাবজাত যোগ্যতা ও আল্লাহ প্রদত্ত মেধা পাণ্ডিত্যের ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকে । তাঁর দারসে কঠিন থেকে কঠিনতর কোন মাসয়ালা সামনে আসলেও মাত্র কয়েক মিনিটের ভিতর সমাধান দিয়ে দিতেন ।
ইলমে ওয়াহীর অগাধ পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি, দর্শন, ভূগোল, জ্যামিতি, ও গণিত বিদ্যায়ও ছিল অসাধারণ দক্ষতা । পিতার অবর্তমানে শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) যখন পিতার আসনে সমাসীন হলেন, তখন তাঁর চোখের কোনে ভেসে ওঠল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত মানবতার করুন চিত্র । গোটা ভারতের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র দিল্লিতে বসে তিনি বেদনার্ত হৃদয়ে, অশ্রুশিক্ত নয়নে প্রত্যক্ষ করেন, সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে আসা শ্বেত ভল্লুকদের অকথ্য ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের গগনচুম্বী পাহাড় ।
তখন শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) সব কিছু উজাড় করে দিয়ে এগিয়ে আসেন বেদনার্ত ও শোক-দগ্ধ জনতাকে মুক্ত করতে । তিনি ছিলেন যথার্থ মুসলমান এবং সত্যিকার ত্যাগী ও দেশপ্রেমিক নেতা । কৃষক-শ্রমিক, মাঝি-মাল্লা, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার সকলেরই দুঃখ দুর্দশা ও শোচনীয় অবস্তা শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) কে দারুণ ভাবে ব্যথিত ও প্রভাবিত করে ।
ব্রিটিশ বেনিয়াদের চরম নির্যাতনের মুখে যখন রাজপথ শুন্য, যখন উৎপীড়িত জনতা নিরুপায় হয়ে দিক-বিদিক ছুটোছুটি করছে, যখন নির্যাতনের তীব্রতায় আলেমদের প্রতিবাদী কণ্ঠও স্তব্দপ্রায়, ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) অবতীর্ণ হন প্রতিবাদী ভূমিকায় । ভারতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এটাই প্রথম কোন শীর্ষ আলেমের স্বৈরাচারী জালিম শাহীর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্তান ।
ব্রিটিশ বেনিয়াদের চরম নির্যাতনের সার্বিক পরিস্তিতি পর্যবেক্ষণ করে, শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) গোটা ভারতে ফতোয়া জারি করলেন- এখন থেকে এদেশের মুসলমানরা 'দারুল হারব' তথা শত্রু কবলিত দেশের অধিবাসী । সুতরাং ঈমান, ইসলাম ও দেশ রক্ষার্থে এবং ক্ষমতার মসনদ থেকে চির অভিশপ্ত কাফের অমুসলিমদের অপসারণ কল্পে জিহাদে ঝাপিয়ে পড়া এখন প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ । যে এই ফরজ আদায়ে সামান্যতম শৈথিল্য প্রদর্শন করবে, সে যেন কোরআনের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্তান নিলো ।
শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) এর এই ফতোয়া ছিল ব্রিটিশ বিতাড়নের মধ্য দিয়ে ভারত বর্ষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ । তাঁর এই ফতোয়া ইংরেজদের ভীত কেঁপে ওঠে । সত্যি বলতে কি; ভারতের স্বাধীনতার জন্য এই ফতোয়া ছিল ভিত্তিপ্রস্তর । ভারতের পথে-প্রান্তে, অলিতে-গলিতে, এবং ঘরে ঘরে যখন এই ফতোয়ার বাণী পৌঁছে গেলো, তখন নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলমানগণ উদ্যেম ফিরে পেলো । পেলো নব চেতনা । শুরু হল ইংরেজ বিরোধী গণজোয়ার । জুলুম অত্যাচারের প্রচণ্ডতায় একসময় যারা ছিল নীরব, এখন তারা পুরোদমে সরব । একসময় যারা ইংরেজ বিরোধী কথা বলতে সাহস পেত না, আজ তারা বলিষ্ঠ ও সক্রিয় কর্মী ।
শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) ছিলেন একজন বিজ্ঞ সুদক্ষ লেখক এবং অনলবর্ষী বক্তাও । জাতীর এই দুর্দিনে তিনি লিখনির মাধ্যেমে ভারতবাসীকে বুঝিয়ে দিলেন স্বাধীনতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা । পাশাপাশি জানিয়ে দিলেন গোলামী ও পরাধীনতার ক্ষতি ও অপকারিতা । মঙ্গল ও শুক্রবার সপ্তাহে দুদিন দিল্লিতে তাঁর দারস হত । এই সুবাদে তিনি অত্যান্ত জ্বালাময়ী কণ্ঠে ভাষণ দিতেন, যাতে মুসলমানদের মাঝে স্বাধীনতার প্রেরণা এবং তা অর্জনের নব চেতনার সৃষ্টি হয় ।
শাহ আব্দুল আজীজ (রাহঃ) এর লিখিত একটি আরবী গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, তিনি শিখ ও মারাঠাদের লুটতরাজের বিরুদ্ধে ও বহু কাজ করেছেন । প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছিলেন ।
তাঁর ক্লাসের পরিধি ছিল বিস্তৃত । যারা তাঁর ক্লাসে আসতো, তারা মুজাহিদ ও যোগ্য নেতৃত্বের অধিকারী হয়ে ফিরত । এবং দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজ বিরোধিতার বীজ রোপণ করতো ।
শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) সত্তর বছর বয়সে, ১৮২৩ ঈসায়ী সনে, ইহলোক ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান । বিদায়কালে তিনি নিজ হাতে গড়া এমন একদল আত্মোৎসর্গী কর্মী বাহিনী রেখে যান, যারা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পতাকা হাতে এগিয়ে যান । তাঁদের মধ্যে হযরত শাহ ইসমাইল শহীদ, সায়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভীও ছিলেন । যারা পাঞ্জাবে হিন্দুদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বালাকোটের রণাঙ্গন সৃষ্টি করে ইসলামের পতাকাকে সমুন্নত করেছেন ।
Powered by Blogger.