Header Ads

জমিয়তের জাগরণে আল্লামা কাসেমী

বিশেষ প্রতিবেদন :: জমিয়ত উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইসলামি সংগঠন। দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরদের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে এ দল গঠিত হয়। দীর্ঘ ৯৮ বছরের পথপরিক্রমায় জমিয়ত রচনা করেছে ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়। উপমহাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে জমিয়তের অবদান অপরিসীম। ভারত এবং পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের ইতিহাসেও জমিয়ত উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। ইতিহাসের কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে জমিয়তকে নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করতে হয়েছে। চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে জমিয়ত বাংলাদেশের একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় জমিয়তের শাখা রয়েছে। নিয়মিত কার্যক্রম চলছে দেশব্যাপী। হেফাজত কেন্দ্রীক ধর্মীয় আন্দোলনে জমিয়তের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। বিশ দলের শরীকদল হিশেবেও শক্ত অবস্থানে জমিয়ত।
মূলত জমিয়তের পুনরুত্থান শুরু হয় বিগত জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে। ২০১৫ সালের ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পান দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি পাওয়া আল্লামা কাসেমি একজন দক্ষ সংগঠকও। মুফতি মাহমুদ গাঙ্গুহি অন্যতম খলিফা, দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতি ছাত্র আল্লামা কাসেমি সর্বমহলে সমাদৃত একজন বরণীয় আলেম। হেফাজতে ইসলাম কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগরির আমির। ঐতিহাসিক শাপলা চত্ত্বরের অন্যতম সংগঠক তিনি। আল্লামা কাসেমি মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর জমিয়তে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। তাঁর কারিশম্যাটিক নেতৃত্বে অল্প দিনেই সুসংহত হয় জমিয়ত।২০১৪ সালে আল্লামা কাসেমির আহবানে দেশের প্রায় ১০জন শীর্ষ ইসলামী রাজনীতিবিদ জমিয়তে যোগ দেন। এখান থেকেই শুরু হয় জমিয়তের অগ্রযাত্রা। যোগদানকারী অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে দলকে ঢেলে সাজান কাসেমি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে যুব জমিয়ত এবং ছাত্র জমিয়তের শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। বিপুল প্রস্তুতি নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা মহানগর জমিয়ত, যুব জমিয়ত এবং ছাত্র জমিয়ত। যেখানে আগের মহাসচিবের ২৪ বছরের দায়িত্বকালে কমিটি হয়েছিলো মাত্র ছয়টি জেলায়, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তির মাত্র দু’বছরের মাথায় আল্লামা কাসেমি প্রায় পঞ্চাশটির মতো জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন করেন। প্রাক্তন মহাসচিব দায়িত্ব ছাড়ার পর নতুন মহাসচিবের কাছে কোনো ধরণের খাতাপত্র, হিশাব নিকাশ বা নথিপত্র- কিছুই হস্তান্তর করেন নি। একেবারেই শূন্য হাতে কাজ শুরু করে আল্লামা কাসেমি এক বছরের মাথায় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পল্টনে বিশাল অফিস করে দলের কার্যক্রম নিয়মের আওতায় আনেন। ফাইলপত্র, কাগজখাতা, হিসাব কেতাব সবকিছুর বন্দবস্ত করা হয়। আল্লামা কাসেমির সবচে’ বড় অবদান হলো তিনি দায়িত্ব পাওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই দলের একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। এর আগে অসম্পূর্ণ নামমাত্র একটি গঠনতন্ত্র চালু ছিলো। দায়িত্বপ্রাপ্তির এক বছরের মাথায় কাসেমি বার্ষিক কাউন্সিল আহবান করেন। সারা দেশ থেকে দুই শতাধিক উপজেলা প্রতিনিধি কাউন্সিলে উপস্থিত হয়ে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। এটা বাংলাদেশ জমিয়তের ইতিহাসে নজিরহীন ঘটনা। আল্লামা কাসেমি নতুনভাবে এককোটি সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সারাদেশে সদস্য সংগ্রহ অভিযান ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে এই পদক্ষেপ দেশব্যাপী বিপুল সাড়া পায়। দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা স্বার্থপরদের দলের স্বার্থবিরোধী বিতর্কিত বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে সদস্য সংগ্রহ অভিযান কিঞ্চিত বাধাগ্রস্ত হলেও একেবারে স্থিমিত হয়ে যায় নি। বর্তমানেও বিচ্ছিন্নভাবে সারাদেশে সদস্য সংগ্রহ চলছে। আল্লামা কাসেমির অন্যতম অবদান হলো দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় বিরোধপূর্ণ কিছু জেলা ও মহানগরে শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এসব শাখায় এখন নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিলেট মহানগর জমিয়ত এবং মৌলভীবাজার জেলা জমিয়ত। আল্লামা কাসেমি তাঁর মেয়াদকালে দলের সাংগঠনিক ভীত মজবুত করতে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। গণসংগঠনের মতো অঙ্গসংঠনসমূহকেও নিয়মের আওতায় এনে তিনি ঢেলে সাজিয়েছেন। বর্তমানে সকল শাখার কার্যক্রম অতীতের যেকোনো সময়ের চে’ শক্তিশালী এবং সুসংহত। বিশ দলীয় জোটে বর্তমানে জমিয়ত শক্ত অবস্থানে। জোটের বড় দু’দলের পরই জমিয়তের অবস্থান। বিএনপি জোটে বর্তমানে কওমি ধারার প্রধান দল জমিয়ত। বিশ দলের মহাসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগিরের ডানপাশে তাঁকে বসতে দেখা গেছে। এছাড়া সরকারের সাথে বিভিন্ন দেনদরবার, ইসির সাথে সংলাপ, কওমি সনদের স্বীকৃতি, হেফাজতের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্দোলনে জমিয়তের অবস্থান ছিলো চোখে পড়ার মতো। সর্বশেষ রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় কনভেনশন করে বৃহৎ ঐক্যের ডাক দেয় জমিয়ত। এসবই হয়েছে আল্লামা কাসেমির দূরদেশী নেতৃত্বে।আল্লামা কাসেমির আমলে বহির্বিশ্বের জমিয়তের সাথে বাংলাদেশ জমিয়তের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কাসেমি ভারত জমিয়তের আমীর আল্লামা সাইয়িদ আরশাদ মাদানীর একান্ত আস্থাভাজন। পাকিস্তান জমিয়তের শতবার্ষিকী সম্মেলনে কাসেমি বাংলাদেশ থেকে পাঁচ সদস্যের এক প্রতিনিধি দলও পাঠান। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ জমিয়ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীয় অস্তিত্বে জানান দিতে সক্ষম হয়। আল্লামা কাসেমি তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের কারণে দেশের ইসলামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। বিশেষ করে ঢাকায় সর্বদলীয় যেকোনো আন্দোলন তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। দলমত নির্বিশেষে সকলেই কাসেমিকে নেতা হিসেবে মানেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এটা তাঁর এবং দল হিসেবে এটা জমিয়তের অনন্য অর্জন। আল্লামা কাসেমি জমিয়তের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর সচেতন মহল খুশিই হয়েছিলো। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এটা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলো। বারবার আশাহত হওয়া ইসলামপ্রিয় জনতা নতুনভাবে স্বপ্ন দেখাও শুরু করেছিলো। কাসেমি তাঁদের আস্থার প্রতিফল ঘটাতে সক্ষমও হয়েছলেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে সারা দেশে জমিয়তের জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো। এটা ভালো মানুষের কাছে ভালো লাগলেও সহ্য হয় নি কিছু খারাপ মানুষের। কখনো পর্দার আড়াল থেকে কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁরা শুরু করে ষড়যন্ত্র। একের পর এক আঘাত সামলাতে হয় বয়োবৃদ্ধ কাসেমিকে। তারপরও তিনি দমবার পাত্র নন। অদম্য মনোবল আর অসীম সাহস নিয়ে কাসেমি এগিয়ে যাচ্ছেন লক্ষ্যপাণে। সাথে আছেন পুড় খাওয়া অভিজ্ঞ কিছু শীর্ষ আলেম। আছেন হার নামা কিছু স্বপ্নপাগল তরুণ। আছেন একঝাক মেধাবী ছাত্র। আরো আছে আকাবিরীন হযরাতের মাকবুল দোয়া। ইনশা আল্লাহ কাসেমি থামবেন না। থামবে না তাঁর অগ্রযাত্রা। আঁধার ভেঙ্গে একদিন আলো আসবেই। রাত পোহালেই জাগবে সোনালি প্রভাত। কেবল সেই দিনের অপেক্ষা।
লেখক: ফরহাদ আহমাদ
সম্পাদক উকাব২৪.কম, সাহিত্য সম্পাদক- ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
Powered by Blogger.