Header Ads

রোহিঙ্গার ত্রাণ নিজ এলাকায় দিলেন এমপি নদভী

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও বর্বরতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নামে মালয়েশিয়ার দাতা সংস্থা থেকে ত্রাণ এনে নিজের নির্বাচনী এলাকা সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিতরণ করেছেন আওয়ামী লীগদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী। মালয়েশিয়ার দাতা সংস্থা ‘কেলাপুত্রা-১’ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ৭০ কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রীর মধ্য থেকে ২০ কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার দরিদ্র জনগণের মধ্যে সংসদ সদস্য নদভীর প্রতিষ্ঠিত আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে বিতরণ করেন সংসদ সদস্য নিজেই। ত্রাণ বিতরণের সময় দাতা সংস্থার পক্ষের একটি ব্যানারও টাঙানো হয় অনুষ্ঠানস্থলে।
গত মাসের শেষ সপ্তাহে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সময় অনুষ্ঠানস্থলে টাঙানো ব্যানারে ইংরেজিতে লেখা রোহিঙ্গা ও মালয়েশিয়া শব্দগুলো দেখে স্থানীয়রা বিস্মিত হয়। দুর্গত রোহিঙ্গাদের নামে আসা ত্রাণ কেন সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিতরণ করা হচ্ছে—এ নিয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের মধ্যেই ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সংসদ সদস্যের এমন কর্মকাণ্ডের বিস্তর সমালোচনাও চলছে।সংসদ সদস্য নদভীর প্রেসসচিব অধ্যাপক শাব্বির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্যাদুর্গত ও হতদরিদ্রদের মাঝে ২০ কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন আবু রেজা নদভী। এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, বিভিন্ন দেশ যেমন—তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার দাতা সংস্থার অর্থায়নে দুই দশক ধরে সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসীর দুর্যোগ মুহূর্তে ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন পাশে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার দাতা সংস্থা কেলাপুত্রা-১-এর পক্ষ থেকে ২০ কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। সংসদ সদস্যের তত্ত্বাবধানে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার ৩০ হাজার পরিবারের তালিকা তৈরির পর তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ২৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দুই উপজেলায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। ত্রাণ বিতরণের সময় তোলা ছবিতে দেখা গেছে, একটি গরু জবাই করা হচ্ছে।
পাশে দুজন লোক একটি ডিজিটাল ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যানারে ইংরেজিতে লেখা আছে, ‘আরাকান ২০১৭, কোরবান, ওরগানাইজেশন’। অন্য একটি ব্যানার নিয়ে কিছু ত্রাণসামগ্রীর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন সংসদ সদস্য নিজেই। তাঁর পাশে কয়েকজন অনুসারীও রয়েছে। ব্যানারে লেখা ‘হিউম্যানিটেরিয়ান ও এইড মিশন ফর রোহিঙ্গা ইন বাংলাদেশ’। এই ব্যানারটি ধরে একটি ঘরে ছবি তোলা হয়। ব্যানারে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ নাজিব রাজাকের ছবিও রয়েছে।
বিতরণ করা ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে কী ছিল জানতে চাইলে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নে প্রায় ২৯৫ জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে চাল, ডাল, তেল, কাপড়, সাবান, টুথব্রাশ, পেস্ট ইত্যাদি ছিল। তবে ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেটজাত ত্রাণ আলাদা করে বিতরণ করা হয়। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫০০ জনের তালিকা করতে বলেছিলেন সংসদ সদস্য। পরে সেখান থেকে ত্রাণ রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠাতে হচ্ছে উল্লেখ করে কিছুটা কমানো হয়। ’ গরু জবাইয়ের সময় পাশে আরাকান লেখা ব্যানার টাঙানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গরু কোথায় জবাই হয়েছে আমি জানি না, তবে আমার ইউনিয়নের ৩০টি পরিবারের জন্য প্যাকেট ভর্তি করে মাংস পাঠানো হয়েছিল। তা যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়। ’
রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ত্রাণ সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিতরণ করা নৈতিকভাবে ঠিক হয়েছে কি না?
এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সব ত্রাণ যদি রোহিঙ্গাদের জন্য আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা রোহিঙ্গাদের কাছে পাঠানো উচিত ছিল। তবে সংসদ সদস্য আমাদের বলেছেন, এই ত্রাণের কিছু অংশ রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো হয়েছে। ’
রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ত্রাণ সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষের মধ্যে বিতরণ করে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষকেই প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম দুলু। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ত্রাণ রোহিঙ্গাদের মধ্যেই বিতরণ করা উচিত ছিল। তারা আরাকানে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে অবস্থান করছে। সেখানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখন নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ এনে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিতরণ করে এই এলাকার মানুষকেই রোহিঙ্গা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা আমাদের জন্য চরম অবমাননাকর। ’
রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ত্রাণ কেন সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হলো এমন প্রশ্নে সংসদ সদস্য নিজামউদ্দিন নদভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুদান আনার সময়ই একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষের জন্যও ত্রাণ বিতরণের কথা স্পষ্ট লেখা আছে। চুক্তি অনুযায়ী আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনজিও ব্যুরো ত্রাণ বিতরণের অনুমতি দেয়। এর পর যথযাথ প্রক্রিয়ায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। এই সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি সম্বলিত ব্যানারও ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও কিছু ত্রাণ আমি উত্তারাঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও পাঠিয়েছি। ’ এমপি দাবি করেন, কিছু লোক তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
উৎসঃ   কালের কন্ঠ
Powered by Blogger.