Header Ads

কূটনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে মিয়ানমার

রাখাইনে সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থামিয়ে দিতে মিয়ানমার সরকার কূটনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে। স্টেট কাউন্সিলরের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাং তুন ইতোমধ্যে দেশের সংঘাত-পূর্ণ পশ্চিম এলাকার ব্যাপারে নেপাইথো সরকারের অবস্থান জানানো ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে যুক্তরাষ্ট্রে এক আকস্মিক সফর সেরে এসেছেন। এখন জাতিসংঘে সরকারের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
জাতিগত সহিংসতার মূল কারণ ও এই সমস্যার সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা এশিয়ার আঞ্চলিক মিত্র ও আসিয়ান সরকারগুলোকে অবহিত করার জন্য কূটনীতিকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাজধানী নেপাইথোতে ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি’র সঙ্গে অং সাং সু চি ও সেনা প্রধান জেনারেল মিন অং হিলাইং-এর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত কয়েক দিনের মধ্যে চীন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও সু চির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর সবগুলো বৈঠকের মূল ইস্যু ছিলো রাখাইন পরিস্থিতি।
যদিও বিশিষ্ট জনদের এসব সফর আগে থেকেই নির্ধারিত ছিলো, কিন্তু স্টেট কাউন্সিলর এই সুযোগে অতিথিদের কাছে তার সরকারের সমস্যা এবং পরিস্থিতি নিরসনে তাদের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরছেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো চলতি মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘে এসব দেশের সমর্থন পাওয়ার জন্য এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন সু চি।
এক সপ্তাহ আগে ব্যাংককের খোন কায়েন-এ অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সামরিক নিরাপত্তা বৈঠকের ফাঁকে মিয়ানমার সেনা প্রধান হিলাইং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুট চানুচা ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল সুরাপং সুয়ান্নার কাছে ইস্যুটি তুলে ধরেন। এসব বৈঠকে সরকার তার যুক্তিসমূহ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এবং দু’সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া সহিংসতায় বাস্তচ্যুত হাজার হাজার উদ্বাস্তুর জন্য মানবিক ত্রাণ সহযোগিতা চেয়েছে।
জাতিসংঘের আসন্ন অধিবেসনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হবে ভেবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকার বেশ উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত প্রফেসর ইয়ানঘি লি’র রিপোর্টেও মিয়ানমার সরকারের ব্যাপক সমালোচনা থাকবে বলে নেপাইথো আশংকা করছে। গত জুলাইয়ে মিয়ানমার সফরের ওপর তিনি নিউ ইয়র্কের থার্ড কমিটি’র কাছে এই রিপোর্ট পেশ করবেন বলে কথা রয়েছে।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ অধিবেশনে নতুন করে দাবি উঠবে বলে দেশটি আশংকা করছে। তাদেরকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ সংঘটনের জন্য দায়ি করা হতে পারে। এবং গত মার্চে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক তদন্ত দলকে মিয়ানমারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশংকা হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিতে পারে: মিয়ানমারের জন্য এটা হবে একটি ভয়াবহ বিপর্যয়।
মুসলিম দেশগুলোর সংস্থা ওআইসি’র সদস্য দেশগুলো মিয়ানমার সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হবে বলে ইতোমধ্যে লক্ষণ ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের পর এই আশংকা জোরদার হয়। তাই এই আন্তর্জাতিক সংস্থায় মিয়ানমার সরকারের প্রতি উষ্ণ সমর্থন আদায়ের জন্য দেশটি তার এশীয় প্রতিবেশি ও মিত্রদের প্রতি হাত বাড়িয়েছে।
জাকার্তা ও কুয়ালালামপুরের কিছুটা আপত্তি থাকলেও বেশিরভাগ আশিয়ান সদস্যের সমর্থন আশা করছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদে যখন যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে প্রাথমিক আলোচনার সূত্রপাত হয় তখন বেইজিং তার অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। এই আলোচনায় ভেটো প্রয়োগের হুমকি দেয় চীন, এবং দেশটি অবশ্যই তা করবে এবং সাধারণ পরিষদের আসন্ন বৈঠকে তর্জনগর্জন এতে অনেকটা থেমে যাবে।
ইয়াংগুনের কূটনীতিকরা জানান, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোন প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নেয়া হলে রাশিয়াও তাতে ভেটো দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান ততটা স্পষ্ট নয়। কিছু কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের আচরণের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ঠান্ডা করতেই মূলত গত সপ্তাহে লন্ডন বিষয়টি উত্থাপন করেছে, এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেয়া হয় যে কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালায় গুরুত্বপূর্ণ সমাধান দেখিয়ে দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রশমন ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কিছু অন্তর্নিহিত কারণ দূর করার প্রচেষ্টায় এটাই স্টেট কাউন্সিলরের কৌশল। আগেও তাই ছিলো বলে সরকারের ভেতরের সূত্রগুলো জানায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতায় সুচি’র এই পরিকল্পনা লাইনচ্যুত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। বর্তমানে রাখাইন নিয়ে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীরা রাজধানী নেপাইথোতে মিলিত হয়ে আনান কমিশনের সুপরিশমালার ভিত্তিতে একটি রোডম্যাপ তৈরির কাজ করছেন। গত কয়েক দিন ধরে তারা নতুন ধারণা ও উদ্দীপনার জন্য আরাকানের ব্যাপারে মিয়ানমারের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা করছে।
এই দলটি একটি ব্যাপকভিত্তিক ‘গেমপ্লান’ তৈরির জন্য কাজ করছে। তাদের সামনে অগ্রাধিকার হিসেবে যে প্রধান দুটি সমস্যা হাজির হয়েছে তার একটি হলো নাগরিকত্ব ইস্যু। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ক্ষোভের কারণ যে এটাই তা সহজে অনুমেয়। তাই সরকারকে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে: দ্রুত আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এটা এমনভাবে করতে হবে যা হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এর অতিসাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে পূর্ব তিমুর, একে মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে সরকারের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে।
এতেও অবশ্য সময় লাগবে এবং এতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবে না। তারা বলছে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য। এই আইন পরিবর্তন বা পুনর্বিবেচনা নিয়ে আলোচনা হলেও সেনাবাহিনী এর বিরোধিতায় অটল। সু চির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায় যে, তিনি এই আইন সংশোধনের পক্ষে। তবে, এটাও জানেন যে চাইলেও শিগগিরই তা করা যাবে না।
আনান কমিশনের একটি সুপারিশ – চলাচলের স্বাধীনতাও অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে বলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতারা দাবি জানিয়েছেন। যদিও রাখাইনের উত্তরাঞ্চল এমন কি সিত্তুই পর্যন্ত যাওয়াও অনেক কষ্টকর, কিন্তু রাজ্যের বাইরে যাওয়া এক রকম অসম্ভব। এই দাবি মেনে নেয়া ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমক্রেসি’র ১৮ মাস বয়সী সরকারে পক্ষে আরো কঠিন। এ নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পেপারওয়ার্ক অনেক হয়েছে এবং সমস্যাটি আরো বেশি জটিল হয়েছে। অবিলম্বে এর সমাধান হওয়া উচিত।
মুসলিম যুবকরা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে সরকার দাবি করলেও মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ এখনো মরিচিকা। মুসলিম শিক্ষার্থীদের শুধু দূর-শিক্ষণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে বলে রাখাইনে সক্রিয় মুসলিম নাগরিক গ্রুপগুলো জানিয়েছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নতুন ধারণাটি সম্ভবত একটি মিনিস্ট্রিয়াল ‘ফোকাল পয়েন্ট’ প্রতিষ্ঠা। আনান কমিশনও এর জন্য সুপরিশ করেছে। এটি রাখাইনের ওপর নবগঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির সঙ্গে কাজ করবে।
এদিকে, সরকার এই মুহূর্তে বড় ধরনের মানবিক সংকটের সম্মুখিন হয়েছে। শরনার্থী ও বাস্তচ্যুত লোকজন সহিংসতা থেকে বাঁচতে অব্যাহতভাবে পালিয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কিছু সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা সাউথএশিয়ানমনিটর.কম’কে বলেছেন যে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রাথমিক অগ্রাধিকার। রাখাইনের নিরাপত্তা ইস্যুগুলো কিভাবে সামাল দেয়া হবে তা নিয়ে সেনা প্রধান ও স্টেট কাউন্সিলর অং সাং সু চি’র মধ্যে মতবিরোধ কোন গোপন বিষয় নয়। তবে সবার আগে আইন-শৃঙ্খলা পুন:প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।
যদিও সু চি গত অক্টোবরে রাখাইনে সেনাবাহিনীকে ইচ্ছা মতো কাজ করার অধিকার দিয়েছিলেন বলে মনে হয় কিন্তু তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ওই নির্দয় নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি চাননি। সে সময় বেশ কিছু সীমান্ত ফাঁড়িতে মুসলিম একটিভিস্টদের হামলার জের ধরে দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান চালায়।
অন্যদিকে, সেনাবাহিনীও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। শুরু থেকেই তারা রাখাইনে ‘জরুরি অবস্থা ও সামরিক আইন’ জারির দাবি জানিয়ে আসছে যেন আগের চেয়েও আরো বাধাহীনভাবে দমন অভিযান চালাতে পারে। তবে, এবারের সহিংসতা শুরু হওয়ার পর সেনাবাহিনী আরো সোচ্চার হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনী দাবি করছে যে রাখাইনকে রক্ষার জন্য সরকারকে ভুচিদং, মংডু ও রাথেদং টাউনশিপে জরুরি অবস্থা ও সেনাশাসন জারি করতে হবে। মিলিটারি এ্যাফেয়ার্স সিকিউরিটি’র উপপ্রধান মেজর-জেনারেল থান হুতুত থেইন এ কথা বলেন।
সু চি ও তার সরকার বার বার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদ (এনএসডিসি)’র সভা ডেকে তাতে সবাইকে জরুরি অবস্থার ব্যাপারে একমত হতে হবে।
এনএসডিসি’তে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা বেশি। এতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট, দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট – এদের একজন আবার সামরিক বাহিনীর নিয়োগ করা, পার্লামেন্টের দুই কক্ষের দুই স্পিকার, সেনা প্রধান ও তার ডেপুটি, এবং সেনাবাহিনীর নিয়োগ করা তিন মন্ত্রী – প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, ও সীমান্ত নিরাপত্তা, এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী’র দায়িত্ব পালনকারী অং সাং সু চি।
এই সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট তার বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে পুরো মংডু জেলাকে ‘সামরিক অভিযানের আওতাধীন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এটা সেনাবাহিনীর অর্ধেক দাবি মানার মতো। সরকার আশা করছে এর ফলে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং ‘রাখাইন রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন শুরু করা যাবে। কয়েক সপ্তাহ পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সু চি’র বক্তব্যে এই ‘রোডম্যাপ’ খোলাসা হবে বলে আশা করা যায়।
southasianmonitor
Powered by Blogger.