Header Ads

বেঁচে ফেরাদের মুখে রোহিঙ্গা গণহত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা

জ্বলছে রাখাইন, পালাচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা। ২৪ আগস্টের পর থেকে জাতিসংঘের হিসাবে, মিয়ানমারের সেনা অভিযানে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। আর প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বর্ণনায়, প্রকৃত অর্থে রাখাইনে নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এমনই একটি গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বর্মি সেনাদের গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন মংডুর মেরুল্যা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা। শনিবার রাতে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার উনচিপ্রাং এলাকায় এই প্রতিবেদকের কাছে তারা তুলে ধরেন গণহত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা।
মেরুল্যা গ্রামের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা হাসিম উল্যাহ জানান, ২৫ আগস্ট তারা এক সঙ্গে ৬ শহীদকে কবর দিয়েছেন। এর মধ্যে চারজনকে এক কবরে, দু’জনকে অন্য কবরে মাটিচাপা দিয়ে কোনো মতে প্রাণ নিয়ে দেশ ছেড়েছেন।তিনি জানান, ওইদিন সকাল আটটায় সেনা ও পুলিশের প্রায় দেড় শতাধিক সদস্য মেরুল্যায় গুলি করতে করতে প্রবেশ করে। এ সময় গ্রামের অর্ধশতাধিক কিশোর-যুবক লাঠিসোটা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু এলোপাথাড়ি গুলির মুখে সে প্রতিরোধ সহজেই ভেঙে পড়ে।
এ সময়ই মেরুল্যা শিকদারপাড়ার চারজন ও পূর্বপাড়ার দু’জন শহীদ হন। অনেকে গুলিবিদ্ধ হন।
হাসিম উল্যাহ জানান, তাদের পাড়ায় শহীদ হন আনিস ও জুবায়ের। দু’জনেরই বয়স ২০’র কাছাকাছি। বর্মি সেনারা দুপুর পর্যন্ত গ্রামে ছিল। চলে যাওয়ার পর পাহাড় থেকে ফিরে আনিস ও জুবায়েরকে নুরুল হক মসজিদের পাশে একই সঙ্গে কবর দেওয়া হয়। ওই মসজিদের ইমাম মাওলানা নুরুল হক তাদের জানাজা পড়ান।
এ সময় স্থানীয় আলেম মাওলানা মোশতাক আহমদ ঘোষণা দেন, মগদের (মিয়ানমারের সেনা-পুলিশ) হাতে নিহতরা শহীদ, তাদের গোসল ও কাফনের কাপড় ছাড়াই দাফন করা যাবে।
হাসিম উল্যাহর ভাষ্যে, প্রায় একই সময়ে পাশের শিকদারপাড়ায় মগরা চারজনকে হত্যা করে। তাদের ওই গ্রামের শিকদার মসজিদের পাশে একই কবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এখানে জানাজা পড়ান ওই মসজিদের ইমাম মৌলভী এনামুল হক। নিহতদের মধ্যে রফিক ও জামালের নাম জানেন তিনি।
এই ছয়জনের মৃত্যু ও দাফন নিয়ে একই ধরনের বর্ণনা দেন মেরুল্যা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা রহিম উল্যাহ। তিনিও প্রাণ ভয়ে আশ্রয় নিয়েছেন টেকনাফে।
তিনি বলেন, আনিস ও জুবায়েরকে দাফনের পর ঘরে চলে আসি, ভয়ে পাশের পাড়ায় যায়নি।
মেরুল্যা পূর্বপাড়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ছিলেন হাসিম উল্যাহর ছেলে মংডুর একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ।
নিহত আনিস ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল দাবি করে নিজের মোবাইলে তার ছবি দেখায় সে। বলে, ‘ঘটনার দিন সকালে সেনাবাহিনী দেখে আমরা সবাই বাজারের মুখে জড়ো হয়েছিলাম। গাড়ি থেকে নেমেই মগরা গুলি করতে করতে গ্রামে ডুকে পড়ে। আমি ও আনিস পাশাপাশি ছিলাম। আনিসের বুক ও মাথায় গুলি লাগে। এ সময় সে পড়ে যাওয়ার সময় আমি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করি। আমার কাছে সে পানি চেয়েছিল কিন্তু, আমি তাকে পানি দিতে পারিনি।’
মোহাম্মদ ইউসুফ জানায়, ওইদিন গ্রামের সবাই পাহাড়ে পালিয়ে যায়। পরের দিন অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমরা আরও দু’একদিন ছিলাম। গ্রামের ১৫/২০ জন গুলিবিদ্ধ ছিল, আত্মীয়-স্বজনরা কি করবে বুঝতে পারছিল না। রাস্তার মুখে সেনা ও পুলিশ অবস্থায় নেওয়ায় পাড়া থেকে তাদের বের করা যাচ্ছিল না।
এটাই গণহত্যা
১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ কনভেশন অনুযায়ী মোট পাঁচ ধরনের অপরাধ ঘটলে, সেটিকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্টে বলা হয়েছে, গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে এ রকম পাঁচটি অপরাধের চারটিই রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হয়েছে।
গত ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত রাখাইনে সেনারা ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এক হাজারের অধিক রোহিঙ্গা মুসলিম রাখাইনেই নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালিয়ে বাংলাদেশে এসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন কমপক্ষে ১০ রোহিঙ্গা।
এছাড়া নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে আসার সময় নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৭২ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরেই রাখাইনে মুসলিমদের ওপর এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে গবেষণারত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুল আজাদ জানান, বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও স্থানীয় সন্ত্রাসীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ক্ষেত্র বিশেষে এই ধ্বংসযজ্ঞ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সংঘাত শুরুর আগেও সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, খাদ্য ও শিক্ষার মত মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা দেওয়া হয়েছে- এসব কিছুই মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
আশরাফুল আজাদ বলেন, ‘সেনা-পুলিশ গ্রামে ঢুকে মর্টার ও লাঞ্চার দিয়ে হামলা করছে। নিরস্ত্র মানুষের ওপর এভাবে হামলার নজির রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব নয়।’
Powered by Blogger.