Header Ads

পুলিশের উপস্থিতিতে ৪৭টি ঘর-বাড়ি গুড়িয়ে দিল বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম রানার চারটি বাড়িসহ ৪৭টি ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে সেই বহিস্কৃত ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুসহ তাঁর ক্যাডারবাহিনী। এসময় ওইসব বাড়ির মূল্যবান আসবাবপত্রগুলো ভেঙে চুরমার করে তারা। 
অভিযোগ রয়েছে, ডাঙ্গা ফাড়িঁর পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতেই অর্ধশত ক্যাডারের বাহিনী নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশিয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে বাড়ি-ঘর ভাংচুরসহ আহত করেছে দুজনকে। গুরুতর আহত একজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী হামলার পর ভাংচুর শেষে পলাশ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও থানা-পুলিশ আদৌ দেলু ও তাঁর ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা নিবে কি না- সেটা নিয়েও সন্দিহান ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবারের লোকজন। গত আড়াই মাসের ব্যবধানে দেলুর হামলার শিকার হয়ে ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক বাড়িঘর ভাংচুর করে দেলু ও তার ক্যাডার বাহিনী। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন এবং তাদের বাড়ি-ঘর ভাংচুর করা হলেও পলাশ থানা পুলিশ দেলু ও তাঁর ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। 
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটনের ভাতিজি জামাই মোজাহিদুল ইসলাম তুষার ও ভাগ্নে মাফুজুল হক টিপুর প্রত্যক্ষ মদদের কারণেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দেলু ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী। বিশেষ করে ভাগ্নে টিপুর মদদেই নানা অপকর্ম করেও দেলু রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন নির্যাতনের শিকার ক্ষতিগ্রস্তরা।
৩৯টি মামলার আসামি দেলুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চায় না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।
ডাঙ্গা ইউনিয়ন যুবলীগের বহিস্কৃত সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুর নেতৃত্বে ক্যাডার বাহিনী মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে হাসানহাটা গ্রামে হামলা চালায়। ওই সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দেলুর চাচাতো ভাই ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি রাজন, কামাল হোসেন, জুয়েল, নয়ন, আরিফ, লিটনসহ দেলুর পালিত সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে আহত করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম রানার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম ও একই গ্রামের আলমাস ফকিরের ছেলে মজিবুর রহমানকে। তাদের দুজনকেই গুরুতর আহত অবস্থায় নরসিংদীর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। গুরুতর আহত জাহাঙ্গীরের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। 
দেলু বাহিনীর হামলায় হাসানহাটা গ্রামের জামাল উদ্দিন মেম্বারের বাড়ির চারটি ঘর, ওয়াকিল উদ্দিনের চারটি ঘরসহ আসবাবপত্র, মমিনউদ্দিনের দুটি পিকআপ, মজিবুর রহমানের একটি ঘর, বিল্লাল সর্দারের ৪টি ঘর, সোহেল মিয়ার সোহেল টেক্সটাইলের মেশিনপত্র ভাংচুর করা হয়। এছাড়া নাজমুল হোসেনের ২টি ঘর,শাহজাহান কবিরের ১টি ঘর, সাব্বির হোসেন, শফিক মিয়া, আলম, আতাউর রহমানেরসহ গ্রামের বিভিন্ন জনের ৪৭টি ঘরবাড়ি ভাংচুর করে দেলুর ক্যাডারবাহিনী।
হাসানহাটা গ্রামের ওয়াকিল উদ্দিনের ছেলে ইকবাল হোসেন বলেন, আমাদের বাড়িসহ ৪৭টি ঘর গুড়িয়ে দিয়েছে দেলোয়ার হোসেন দেলুসহ তাঁর ক্যাডার বাহিনী। ওইসব ঘরের ২৬টি ফ্রিজ, ৩১টি টিভিসহ ঘরের লাখ লাখ টাকার দামী আসবাবপত্রও ভেঙে গুড়িয়ে দেয় দেলু বাহিনী। 
ওই সময় ২২ ভরি স্বর্ণসহ প্রায় ১৭ লাখ টাকাও লুটে নেয় সন্ত্রাসী বাহিনী। শুধু তাই নয়, তাদের তাণ্ডবে তিনটি মোটরসাইকেল এবং দুটি পিকআপ ভ্যান ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পরিবারের অভিযোগ, দেলু বাহিনীর হামলার সময় ঘোড়াশাল ফাড়িঁর সহকারি পরিদর্শক (এএসআই) নুরুল ইসলামসহ ৪ জন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই দেলু বাহিনীর লোকজন হাসানহাটা গ্রামের ৪৭টি ঘর বাড়িতে ভাংচুর চালায়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন ফাড়িঁর এএসআই নুরুল ইসলাম। 
হামলার পর পলাশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তহরুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় হামলায় ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকাও তৈরি করে পুলিশ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথাও বলেতারা। 
এদিকে, ফাঁড়ির পুলিশের উপস্থিতিতে দেলু বাহিনীর হামলার পর থেকেই হাসানহাটা গ্রামের মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করতে দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ যেখানে আমাদের নিরাপত্তা দিবে, সেখানে উল্টো দেলু বাহিনীর সঙ্গে এসে বাড়িঘর ভাংচুরের দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখলো। এমন হলে পুলিশের প্রতি আমাদের আস্থা কীভাবে থাকবে?
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম রানা ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমরা আওয়ামী পরিবারের সন্তান। আমার বাবা জামাল উদ্দিন মেম্বার ৩৫ বছর ধরে ৮ নম্বার ওয়ার্ডের মেম্বার। এখনও তিনি রানিং মেম্বার। সেই আমাদের বাড়িতে হামলা করে ৪টি বাড়ি ভাংচুর করে মাটিতে গুড়িয়ে দিয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করেছে। আমাদের মতো আরো ৪৭টি বাড়ি ভাংচুর করেছে। শুধু তাই নয় ছোট ভাইটিকে কুপিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় এখন ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন আছে সে।
তিনি ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমাদের সরকার ক্ষমতায় আর আমরাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় আছি। এই দেলুর জন্য ইউনিয়নের মানুষের চোখে ঘুম নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন, স্থানীয় এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটনের স্ত্রীর বোনের ছেলে টিপুই হচ্ছেন দেলুর অন্যতম শেল্টারদাতা। টিপু পলাশ উপজেলায় ভাগ্নে টিপু হিসেবেই পরিচিত। টিপু জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যও। এই টিপুর কারণে এমপি পোটনও কিছুই বলে না দেলুকে। গত ঈদুল ফিতরের সময়ও ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাদলেরসহ ৪৫টি বাড়ি-ঘরে ভাংচুর চালায় দেলু। মামলা করলেও এমপির স্বজনদের চাপে মামলা তুলে নিতে হয়েছে। বিশেষ করে এমপির জামাতা মোজাহিদুল ইসলাম তুষার ও ভাগ্নে টিপুর প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দেলু। দেলুর অপকর্মের কারণে সম্প্রতি জেলা যুবলীগ তাকে বহিষ্কারও করেছে। 
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক দেলুর কারণে ডাঙ্গা ইউনিয়নের শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ভয়ানক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে আওয়ামী লীগ আর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। পান থেকে চুন খসলেই নেমে আসে ভয়ংকর নির্যাতন। তাঁর নির্যাতনের শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি অনেক ত্যাগী নেতা দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বিএনপির আমলেও দলীয় নেতারা এমন নির্যাতনের শিকার হয়নি বলে দাবী করেন তারা।
ঘোরাশাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনাচার্জ মো. গোলাম মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পলাশ থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনে গিয়ে তিনি ঘরবাড়ি ভাংচুর করার দৃশ্য দেখতে পেয়েছেন। 
পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এএসআই নুরুল ইসলাম দাঙ্গা পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন। হামলার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন কি না আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে দেলোয়ার হোসেন দেলুর মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
উৎসঃ   কালেরকণ্ঠ
Powered by Blogger.