Header Ads

রোহিঙ্গা প্রশ্নে একই সমতলে চীন-ভারতের নীতি


মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু প্রশ্নে চীন ও ভারত অদ্ভূতভাবে নিজেদের একই স্থানে আবিষ্কার করেছে। কোনো ব্যাপারেই দেশ দুটি একই অবস্থানে না থাকলেও ভারত ও চীন উভয়েই রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে ‘বৃহত্তর ইসলামি সন্ত্রাসী’ তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখছে। দুই দেশের কেউ একে গণহত্যার কাছাকাছি পর্যায়ের মানবিক ট্রাজেডি হিসেবে বিবেচনা করছে না।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি মিয়ানমার সফরের সময় বর্মি নেত্রী আঙ সান সু চির সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে তিন দিনের সফরশেষে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও মিয়ানমার যে একই অবস্থানে রয়েছে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।বুধবার মিয়ানমারের রাজধানীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে চরমপন্থীদের সহিংসতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সহিংসতা এবং নিরীহ জীবন যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, তাতে আপনার উদ্বেগের সাথে আমরা একমত।’
আর স্টেট কাউন্সিলর আঙ সান সু চি তার বক্তব্যে বলেন, ‘সম্প্রতি মিয়ানমার যে সন্ত্রাসী হুমকির মুখে পড়েছে, সে ব্যাপারে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করায় আমরা ভারতকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা একত্রে নিশ্চিত করতে পারি যে সন্ত্রাসবাদকে আমাদের মাটিতে কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর মাটিতে শেকড় গাড়তে দেওয়া হবে না।’
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যৌথ বিবৃতি
মোদির সফরের পর ইস্যু করা যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা বলেন, তারা তাদের সীমান্তে বিরাজমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তারা তাদের নিজ নিজ ভূখন্ডে সন্ত্রাসবাদ এবং চরমপন্থী-উদ্দীপ্ত সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অন্যতম হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে- এটা স্বীকার করে দুই পক্ষ সব ধরনের ও অবয়বের সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করছে এবং একমত হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী সংগঠন ও নেটওয়ার্ককে টার্গেট করে নয় বরং সেইসাথে যেসব রাষ্ট্র ও সত্ত্বা সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করছে, সমর্থন করছে বা অর্থ দিচ্ছে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে তাদেরও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।’
এতে বলা হয়, ভারতের অমরনাথ যাত্রার সময়কার বর্বর সন্ত্রাসী হামলা এবং আরো নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নিন্দা জানাচ্ছে মিয়ানমার। উত্তর রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করছে ভারত।
এতে আরো বলা হয়, উভয় পক্ষ একমত, সন্ত্রাসবাদ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, এ কারণে সন্ত্রাসীদের কোনোভাবেই শহিদ হিসেবে গৌরাবান্বিত করা উচিত নয়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সীমান্ত এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য অভিন্ন সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে মিয়ানমার দৃঢ়ভাবে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখন্ডতার প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা আবারো ঘোষণা করছে। সেইসাথে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বৈরী তৎপরতা চালানোর জন্য মিয়ানমারের মাটি যাতে কোনো বিদ্রোহী গ্রুপ ব্যবহার করতে না পারে সে নীতি দৃঢ়ভাবে সমুন্নত রাখা হবে।
রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থানে যোগ দিয়েছে চীনও
আর এখন চীনও রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থানে যোগ দিয়েছে। এ ব্যাপারে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি ইস্যু করা না হলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানার পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস নোবেলজয়ী পাকিস্তানি মালালা ইউসুফজাইয়ের মিয়ানমার নেত্রী আঙ সান সু চির সমালোচনার সমালোচনা করতে রাখঢাকের পরোয়া করেনি। পত্রিকাটি জানায়, মিয়ানমার এবং পুরো অঞ্চলে ইসলামি জঙ্গিরা যে বিপদের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, তা না বুঝেই মালালা এই বক্তব্য রেখেছেন।
বিশ্লেষক লিউ লুলু বলেন, রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে ব্যাপারে ভুল তথ্যের কারণেই মালালা এই বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আরেকজন নোবেলজয়ীকে আক্রমণের আগে মালালার উচিত ছিল রাখাইন সহিংসতার মূল তথ্য অবগত হওয়া। সঙ্কটটির সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম চরমপন্থীদের মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর ওপর সহিংস হামলার প্রেক্ষাপটে। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
লিউ বলেন, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনসংখ্যার মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় সঙ্ঘাত অনেক দিন ধরেই বিরাজ করছিল। মালালা সম্ভবত অবগত নন যে, তার নিজের দেশের অনেক ইস্যুর মতো রোহিঙ্গা সঙ্কটটিও অত্যন্ত জটিল বিষয়। এটা অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়।
ভাষ্যকার স্মরণ করিয়ে দেন, তালেবানের বিরুদ্ধে নির্ভীক লড়াই করার জন্যই মালালা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, মালালা নিজে সন্ত্রাসবাদের শিকার। ধরে নেওয়া যায়, মুসলিম সন্ত্রাসীদের সহিংসতা নিয়ে তার নিজস্ব অনুভূতি ও চিন্তাভাবনা রয়েছে। ইসলামিক স্টেটের মতো মুসলিম চরমপন্থ’ী গ্রুপগুলো বিশ্বে অনেক সহিংস হামলার জন্য দায়ী। তারা পুরো বিশ্বের অভিন্ন শত্রু।
লিউ বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে এশিয়ার উন্নয়ন এবং বিশ্বশান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। সন্ত্রাসীদের অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। ভূ-কৌশলগত তাৎপর্যমন্ডিত রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর শেকড় গাড়তে ও বিকশিত হতে দেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের হামলার তাৎপর্য বুঝতে পারছেন না মালালা। মিয়ানমার পরিস্থিতি সম্পর্কে তার আরো কিছু জানা দরকার। সু চির প্রতি তার সমালোচনা অযথার্থ।
চীনা ভাষ্যকার বলেন, অন্যদের উপদেশ দেওয়ার আগে মালালাকে আরো অনেক কিছু শিখতে হবে। তিনি এখনো শান্তির মর্মবাণী বুঝতে পারেননি। ২০১২ সালে চরমপন্থীরা তাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল। তাই ওই মুসলিম চরমপন্থীদের তার প্রথম টার্গেট করা উচিত।
সমর্থন প্রদানের কারণ
ভারত ও চীন কেন রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমার সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে? এর জবাব হলো মিয়ানমারে উভয় দেশেরই উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।
বস্তুত, খনিজসম্পদ, বনভূমিতে সমৃদ্ধ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত স্থানে থাকার কারণে উভয় দেশই মিয়ানমারের আস্থা অর্জন করার জন্য প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেছে। উভয় দেশেরই তাদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য মিয়ানমার সরকারের সমর্থন প্রয়োজন।
এক হিসাবে দেখা যায়, মিয়ানমারে ইতোমধ্যেই বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে চীন। দেশটিতে অন্য সব দেশের বিনিয়োগ বিপুলভাবে ছাড়িয়ে গেছে চীন। ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ১২৬টি প্রকল্পে চীন বিনিয়োগ করেছে ১৫ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিমাণ পাশ্চাত্য বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি। ইইউ ওই একই সময় মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলারেরও কম বিনিয়োগ করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সিআইটিআইসি গ্রুপ হলো কিয়ুক পিয়ু বন্দরের প্রধান উন্নয়নকারী। এর সাথে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাও রয়েছে। এতে মিয়ানমারের সবচেয়ে গরিব অঞ্চল রাখাইন রাজ্যে এক লাখ চাকরি সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যের সিত্তুইয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে ভারত। মিয়ানমারের মাধ্যমে মিজোরাম থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও রয়েছে ভারতের।
অবশ্য চীনের তুলনায় মিয়ানমারে ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বেশ কম। তবে ভারত উভয়টাই ব্যাপকভাবে বাড়াতে চাইছে। ২০১৫-১৬ সালে ভারত-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ২.০৫ বিলিয়ন ডলার। অনুমোদিত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ ছিল ৭৩০ মিলিয়ন ডলার। ২২টি ভারতীয় কোম্পানি এই অর্থ বিনিয়োগ করেছে মিয়ানমারে।
রাখাইন রাজ্যের সহিংসতার ব্যাপারে ভারত ও চীন উভয়েই উদ্বিগ্ন। রাজ্যটিতে মুসলিম জনসংখ্যা ৪৫ ভাগ। তবে ভিন্ন মতালম্বীদের সাথে আলোচনা বা সমন্বয় সাধন করে নয়, বরং ‘বৈশ্বিক ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে সম্পর্কযুক্তদের’ বিরুদ্ধে কড়া সামরিক পদক্ষেপেই সমাধান বলে তারা উভয়ে বিশ্বাস করে।
উৎসঃ   southasianmonitor
Powered by Blogger.