Header Ads

মুসলিম নিধনে উস্কানিদাতা এক ভয়ঙ্কর বৌদ্ধ

মান্দালয়ের একটি বৌদ্ধ মঠের ভেতরে পাঁচ কিশোর একটি পোস্টারের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। শিশুর লাশ, রক্তস্নাত সন্ন্যাসী, অস্ত্র হাতে ক্রুদ্ধ জিহাদিদের ছবি নিয়ে এই পোস্টারটি তৈরি করা হয়েছে। তখনই গেরুয়া পোশাক পরা এক সন্ন্যাসীর উদয় হলো। তিনি বললেন, ‘মুসলিমরা আসলে কেমন, এই পোস্টার সেটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
ম্যাসোইইন মঠের সবচেয়ে বিখ্যাত অধিবাসীর নাম অশিন বিরাথু। ধ্যান অধিবেশনের বিরতির সময় তিনি এই বিষয়টিই বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি জানলেন, বৌদ্ধ ধর্ম রয়েছে ভয়াবহ বিপদে।
তিনি উল্লেখ করলেন, কয়েক শ’ বছর আগে ইন্দোনেশিয়া ছিল মূলত হিন্দু ও বৌদ্ধ দেশ। পরে দেশটির ইসলামের কাছে ‘পতন’ ঘটেছে। আর ফিলিপাইন জিহাদি ‘দলগুলোর’ যুদ্ধের কবলে পড়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এরপর মিয়ানমার। ‘অরগানাইজেশন ফর প্রটেকশন অব রেস অ্যান্ড রিলিজিয়নের’ সবচেয়ে চরমপন্থী নেতা হলেন এই বিরাথু। তার সংগঠনটি অবশ্য মিয়ানমারে ‘মা বা থা’ নামেই বেশি পরিচিত। বর্মি বৌদ্ধদের তার কথিত ইসলামের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে তিনি বক্তৃতায় আগুনের ফুলকি ছোটাচ্ছেন।
মিয়ানমারের পাঁচ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমরা প্রায় ৪ শতাংশ। দেশটির প্রধান জাতিগোষ্ঠীকে অনেকে বামার হিসেবে অভিহিত করে থাকে। বাকিরা ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ভারত থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বংশধর। রোহিঙ্গারা সম্ভবত ১০ লাখ। এই বাঙালি সম্প্রদায়টি বাস করে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রাখাইন রাজ্যে। তারা রাষ্ট্রহীন। মিয়ানমার যে ১৩৫টি আদিবাসী জাতিগত গ্রুপের তথ্য সরকারি খাতায় লিপিবদ্ধ করেছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের স্থান হয়নি। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বাস করে এলেও কর্তৃপক্ষ তাদের অবৈধ অভিবাসী বিবেচনা করে।
মিয়ানমারে উগ্র বৌদ্ধরা যাদের লক্ষ্য করে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে তারা মূলত মুসলিম এবং আরো বিশেষ করে এই রোহিঙ্গারা। মুসলিমদের বাড়িঘর, মসজিদ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সাম্প্রতিক বেশ কিছু হামলা হয়েছে। ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নির্যাতন চালানো হয়। এতে প্রায় ২০০ নিহত হয়। নিহতদের বেশির ভাগই মুসলিম। গত বছর রাখাইনে কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে মুসলিম জঙ্গিদের হামলায় ৯ অফিসার নিহত এবং কিছু অস্ত্র লুটের পর সেনাবাহিনী তাণ্ডব চালায়। জাতিসঙ্ঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ বলছে, সৈন্যরা ভয়াবহ মাত্রায় ধর্ষণ, খুন এবং রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে। নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ হাজার লোক পালিয়ে যায়। তবে কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিত সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চলতি সপ্তাহে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর আরো সদস্য পাঠানোর কথা বলেছে।
মিয়ানমার জনসংখ্যার প্রায় ৯০ ভাগ হলো বৌদ্ধ। তাদের সংখ্যা কমছে- এমন কোনো প্রমাণ নেই। সন্ন্যাসীত্বপ্রাপ্ত বা সঙ্ঘের সদস্য হওয়াটা দেশটিতে বেশ জনপ্রিয়। তাদের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ তথা জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশই সন্ন্যাসী। দেশটির নেত্রী অং সান সু চি নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ।
এমন সুবিধাজনক অবস্থায় থেকেও মা বা তার ভয়ে ব্যবসায়ীরা নানা আতঙ্ক শুনছে। তাদের একটি আবেদনে দুই লাখের বেশি সই পড়েছে। একটি চায়ের দোকানে এক তরুণ বর্মি বলল, ‘মুসলিমরা ধূর্ত।’ তারা ‘জন্মহার দিয়ে আমাদের ছাড়িয়ে যাবে’, আরেকজন বলল চেঁচিয়ে। এক ট্যাক্সিচালক জোর দিলে বলল, মুসলিমরা কখনো তার গাড়িতে চড়ে না : ‘মুসলিমদের টাকা যায় মুসলিম ব্যবসায়ে, তারা সেভাবেই কেবল চিন্তা করে।’ এ ধরনের ঢালাও চিন্তাভাবনা সব জায়গাতেই দেখা যায়। ২০১৫ সালে অমুনাফামূলক প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার সেন্টার ফর রেসপনসিবিল বিজনেসের এক জরিপে দেখা যায়, অনলাইনে ঘৃণাসংবলিত যেসব পোস্ট দেয়া হয় তার ৯০ ভাগই মুসলিমদের লক্ষ করে দেয়া।
বিরাথুর আইডিয়াগুলো মিয়ানমার সরকারের মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেনা-প্রাধান্যবিশিষ্ট আগের সরকার মা বা থার এজেন্ডার আলোকে চারটি আইন পার্লামেন্টে পাস করিয়েছিল। একটি আইনে তিন বছরের আগে নতুন শিশুর জন্ম না দিতে মুসলিম পিতামাতাদের বলা হয়। আরেকটি আইনে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। অপর দু’টি আইনে ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য মিয়ানমারে ধর্মান্তর এমনিতেই বিরল ঘটনা। কিন্তু তারপরও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন বেশ কঠোর। কেউ যদি ধর্ম পরিবর্তন করতে চায় তবে তাকে লিখিতভাবে কর্র্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কর্তৃপক্ষ তার সাক্ষাৎকার নেবে। আর বৌদ্ধ কোনো নারী যাতে তার ধর্মের বাইরে কাউকে বিয়ে করতে না পারে, সে জন্যও বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।
নতুন, বেসামরিক সরকারের আমলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এই সরকার দাঙ্গাবাজদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইয়াঙ্গুনে মসজিদ ও মাদরাসা বন্ধ করে দিতে আমলাদের অনুমতি দিয়েছে। মুসলিমরা যখন মসজিদ বন্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নামাজ পড়েছে, তখন তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ‘স্থিতিশীলতা নষ্ট এবং আইনের শাসনের প্রতি হুমকি’ সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইয়াঙ্গুনে বোরকা পরা এক মুসলিম নারী জানান, ‘আমাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো আচরণ করা হচ্ছে। আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হচ্ছে। একটি সাধারণ ঘটনাও দাঙ্গায় পরিণত হতে পারে।’ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাখাইনে ৪ জুলাই একটি নৌকা কেনা নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে একদল বৌদ্ধ এক রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কর্তৃপক্ষ চরমপন্থীদের দমানোর চেষ্টা করেছে। সরকার নিযুক্ত সন্ন্যাসীদের সংস্থা দি স্টেট সঙ্ঘ মে মাসে মা বা থা নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। বিরাথু এর প্রতিক্রিয়ায় জানায়, মা বা থা নয়, সরকারকেই বিদায় নিতে হবে। তার অনুগতরা ইতোমধ্যেই নতুন নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে, একটি রাজনৈতিক দলও গড়েছে। দলটির নেতা মঙ থওয় চুন বলেছেন, তাদের মিশন হলো ‘মিয়ানমারকে আবার মহান’ করা।
এসব ব্যাপার নিয়ে সু চি বলতে গেলে কিছুই বলেন না। কারো কারো যুক্তি, কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। উদারহণ হিসেবে বলা যায়, মিয়ানমারের সবচেয়ে বিখ্যাত মঠ শডাগনের বাইরে চলতি মাসের শুরুর দিকে ক্রুদ্ধ সন্ন্যাসীরা সমবেত হয়ে ঘোষণা দেয়, সরকার বৌদ্ধ ধর্মকে রক্ষা করছে না। তবে ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য একজন মুসলিম প্রার্থীও মনোনীত করেনি।
(ইকোনমিস্ট থেকে)
Powered by Blogger.