Header Ads

মেয়ে-স্বামী-নাতি সবাইকে কেটেছে : মিয়ানমারে নৃশংসতার আরেক ভয়ঙ্কর কাহিনী

কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের কাছে একটি মন্দিরের পাশে একটি খোলা জায়গায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় পাঁচ শ’ রোহিঙ্গা হিন্দু নারী-পুরুষ-শিশু।
মিয়ানমারের রাখাইনে এখন যে ব্যাপক সহিংসতা চলছে, এরাও তার শিকার হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন।
রোহিঙ্গা মুসলিমরা হাজারে হাজারে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও এই প্রথম রোহিঙ্গা হিন্দুদের সেখান থেকে পালিয়ে আসতে দেখা গেল।
কুতুপালং-এর মন্দিরে আশ্রয় নেয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা হিন্দু নারী-পুরুষ বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন কেন তারা সেখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
যে হিন্দু গ্রামটি সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে সেটির নাম ফকিরাবাজার।
দেনাবালার বাড়ি ছিল এই ফকিরাবাজার গ্রামে। তিনি বলছিলেন, অনেক দুঃখে সেখান থেকে তারা পালিয়ে এসেছেন।
“আমাদের গুলি করেছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। ভাত-পানি খেতে দেয়নি। আমরা হিন্দু মানুষ। আমাদের মেরেছে-কেটেছে। আমাদের মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই জন্য আমরা চলে এসেছি। এক গ্রাম থেকেই আমরা চার শ’ জনের মতো এসেছি। যারা মারতে এসেছিল, ওরা কালো পোশাক পরে এসেছিল। ওদের চিনি না। শুধু চোখ দেখা যাচ্ছিল।”
বকুলবালা নামে আরেক শরণার্থী জানান, ফকিরাবাজার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে চিকনছড়িতে ছিল তার বাড়ি। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন ফকিরাবাজারে। তার স্বামী মেয়েকে দেখার জন্য ফকিরাবাজার যান। সেখানে তার স্বামী, মেয়ে এবং নাতি সবাই নিহত হয়েছে।
“সেখানে সব মানুষকে কেটে ফেলেছে। সেখানে আমার মেয়েকে কেটে ফেলেছে। আমার মেয়েকে দেখতে গিয়েছিল আমার স্বামী। আমার স্বামীকেও কেটে ফেলেছে। আমার নাতি ছিল। তাকেও কেটে ফেলেছে।”
হামলাকারীদের চিনতে পেরেছিলেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে বকুলবালা বলেন, কালো পোশাকে আবৃত থাকায় তাদের চেনা যাচ্ছিল না।
“কালো কালো পোশাক পরে ওরা এসেছিল। চোখ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। চিনতে পারিনি। ওরা কাটছিল, মারছিল, গুলি করছিল। সবাইকে মেরে ফেলেছে। ওরা কখনো বার্মিজ ভাষায় কথা বলছিল, কখনো বাংলা বলছিল। ওদের হাতে অনেক ধারালো অস্ত্র ছিল। চিকনছড়িতে যখন ওরা এসে পৌছায়, তার আগেই আমরা পালিয়ে যাই”
শিবকুমার নামে আরেকজন জানিয়েছেন, তার মা বাবা খালা সবাইকে হামলাকারীরা মেরে ফেলেছে।
“হিন্দু মুসলমান সবাইকে মেরেছে। গুলি করেছে। ওরা কালো পোশাক পরা ছিল। আমি চিনি না। চারিদিক থেকে ঘেরাও করে আমাদের মারছে। হিন্দু মুসলমান সবাই এক সঙ্গে পালিয়ে এসেছি।”
চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে : জাতিসঙ্ঘ
জাতিসঙ্ঘ বলছে, গত এক সপ্তাহে প্রায় চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
রাখাইন প্রদেশে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লড়াই শুরু হওয়ার পর এরা বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করতে শুরু করে।
জাতিসঙ্ঘের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছে শরণার্থীদের বড় অংশ এসে জড়ো হয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। সেখানে রাস্তার ধারের প্রতিটি জায়গা এখন শরণার্থীতে ভরা বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ওপর নির্দেশ রয়েছে তারা যেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢুকতে না দেয়। কিন্তু তারপরও প্রতিদিনই হাজার হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে ঢুকছে।
শরণার্থীদের মধ্যে অনেকের শরীরে বুলেটের আঘাত দেখা যাচ্ছে।
সীমান্তে কড়াকড়ির পর অনেক শরণার্থী এখন ছোট ছোট নৌকায় নাফ নদীর মোহনা দিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। অনেকে সাঁতার কেটেও নদী পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে।
নদীতে ডুবে মারা যাওয়া ২৬ জনের লাশ গতকাল বাংলাদেশের দিকে সাগর তীরে পাওয়া যায়।
শরণার্থীদের চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আরো আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে।
কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা রাখাইনে বৌদ্ধদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে খবর প্রচার হওয়ার পর।
জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমার সরকারের প্রতি তাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিবৃত্ত করার যে আহ্বান জানাচ্ছে, তাতে যে তারা সাড়া দেবে, সেরকম কোনো লক্ষণ এখনো নেই।
dailynayadiganta
Powered by Blogger.