Header Ads

সচিবের স্বাক্ষর জাল করে ‘নিবন্ধন সনদ’ বানিয়েছে কলরব!

জাতীয় পর্যায়ে ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে একটি পরিচিত নাম ‘কলরব’। সংগঠনটি দেশে ও দেশের বাইরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। বিভন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের ওয়েলকাম টিউনেও তাদের জনপ্রিয় গানগুলো রয়েছে।
সম্প্রতি সংগঠনটির মালিকানা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক ও ধুম্রজাল। অভিযোগ উঠেছে, যুগ্ম-নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনকালে নানা অভিযোগে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হওয়া আবু সুফিয়ান কলরব নামে আলাদা সংগঠন করে এই বিতর্ক ও ধুম্রজালের সৃষ্টি করেছেন।
আবু সুফিয়ান সংগঠনের মালিকানা দাবি করে নিজেকে কলরবের ‘প্রধান পরিচালক’ পরিচয় দেন। এক পর্যায়ে কলরবের নামে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি ‘নিবন্ধন সনদ’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেম প্রকাশ করার পর থেকে এনিয়ে দুপক্ষে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
সংগঠনের দুই অংশের মাঝে বিরাজ করছে স্নায়ুযুদ্ধ। জল গড়িয়েছে অনেক দূর। থানায় জিডি ও মামলাও দায়ের হয়। এক পর্যায়ে মন্ত্রণায়লের পক্ষ থেকেও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানায় চিঠিও দেয়া হয়।

ঘটনার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যে নিবন্ধন সনদটিকে ঘিরে এ বিতর্ক ও ধুম্রজাল তৈরি হয়েছে সেখানে সংস্কৃতি সচিব ইব্রাহিম হোসেন খান ও শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-নির্বাহী এবিএম আবুল কালাম নামে দুজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। যার নং. ০৯-৭২৫৩।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক অধিদপ্তর নামে কোনো অধিদপ্তর নেই এবং এবিএম আবুল কালামের যে স্বাক্ষর দেয়া হয়েছে সে নামে মন্ত্রণালয়ে কোনো কর্মকর্তাও নেই। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি সচিব ইব্রাহিম হোসেন খানের যে স্বাক্ষর আছে তাও জাল।
আবু সুফিয়ানের এ জালিয়াতির তথ্য পেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থানায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে একটি চিঠি পাঠানো হয়। উপ-সচিব (প্রশাসন-২) সায়মা ইউনুস স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন সনদে সংস্কৃতি সচিবের নাম ব্যবহার করার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।
এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (প্রশাসন-২) সায়মা ইউনুস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিবন্ধন দেয়া হয় না। সচিব স্যারের স্বাক্ষরের তো প্রশ্নই আসে না। একটি সংগঠন এ ধরনের কাজ করেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পল্টন থানাকে আমরা জানিয়েছি।’
সরেজমিনে দেখা যায়, ১৮ পুরানা পল্টনে রয়েছে কলরবের পুরাতন কার্যালয়টি যা দীর্ঘ ১৩ বছর (২০০৪ সাল থেকে) যাবৎ পরিচালিত হয়ে আসছে।

অন্যদিকে পুরানা পল্টনের ৬০/সি ভবনের চতুর্থ তলায় ‘কলরব’ নামে সংগঠনের নামে নতুন অফিস নিয়েছেন আবু সুফিয়ান। সেখানে বসেই পৃথক ভাবে চালাচ্ছেন সংগঠনের কার্যক্রম। ওই ভবনের নিচে কলরবের সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধিত জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন কলরবের কেন্দ্রীয় কার্যালয়’।
এ প্রসঙ্গে কলরবের প্রধান পরিচালক রশিদ আহমদ ফেরদৌস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, দীর্ঘদিন শৃঙ্খলাভঙ্গ, সংগঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আর্থিক কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সভায় একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সে সংশোধনের পরিবর্তে সংগঠনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। পরবর্তীতে আমাদের সংগঠনের নিয়মানুযায়ী সর্বসম্মতিক্রমে গত ৫ নভেম্বর আবু সুফিয়ানকে বহিষ্কার করা হয়।
রশিদ আহমদ ফেরদৌস বলেন, তারপর থেকে সে এ ধরনের অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে। সচিবের স্বাক্ষর নকল করে ভুয়া সনদপত্র দিয়ে কলরবের মালিকানাও দাবি করছে। সচিবের স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে আবু সুফিয়ান ও আনোয়ার শাহ নামে দুজনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় একটি জিডি ও সিএমএম কোর্টে একটি মামলাও করা হয়েছে।
আবু সুফিয়ান শুক্রবার বিকালে পরিবর্তন ডটকমের কাছে তাদের অংশের কলরব সংগঠনটি নিবন্ধিত উল্লেখ করে এর যে সনদ আছে তাও সঠিক বলে দাবি করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তার সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল এ সনদ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

এ বিষয়ে পল্টন থানায় তার বিরুদ্ধে একটি জিডি ও মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জিডির বিষয়ে অন্যদের কাছে শুনেছেন জানালেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে পুরোপুরি অবগত নয় বলে জানান।
এসময় আবু সুফিয়ান আরো বলেন, ‘আমাকে কলরব থেকে যে নিয়মে বহিষ্কার করা হয়েছে তা নিয়মতান্ত্রিক মোতাবেক হয়নি। আমি কখনোই এ সিদ্ধান্ত মানিনি, এখনো মানি না। তাই আমি কলরব আলাদা করে পরিচালনা করছি।’

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক অধিদপ্তর এবং এবিএম আবুল কালাম নামে কোনো উপ-নির্বাহীর অস্তিত্ব পাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আবু সুফিয়ান বলেন, সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল এ সনদ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
আবু সুফিয়ান তার সেই দায়িত্বশীলের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাবেন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রাপ্ত অভিযোগটি আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
Powered by Blogger.