Header Ads

সার্ককে ভণ্ডুল করতে গিয়ে নিজেই বিপদে ভারত

সীমান্তে ভারত ও চীনের সৈন্যরা ডোকলামে পরস্পর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে। এখন এর তৃতীয় মাস চলছে। এই পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা শুধু ভুটান যে আঁচ করতে পারছে তা নয়; ভারতের সব প্রতিবেশীই এটাকে পর্যবেক্ষণ করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কী পরিণতি দাঁড়ায় এবং তখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন ঘটে, সে বিষয়টি মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। (ডোকলাম ইস্যু থেকে) ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের একটি সমস্যা মোকাবেলার ব্যাপারে সম্ভবত শিক্ষা নেবে। সেটা হলো, স্থলভাগে কিংবা সমুদ্রে তিন দেশের যে বাস্তব বা কল্পিত সংযোগস্থল রয়েছে তাদের সীমান্তে, তা নিয়ে উদ্ভূত সমস্যা।
একজন চীনা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ভারতের পড়শিদের এ ব্যাপারে স্নায়ুচাপে ফেলার আশা করছিলেন। এবার ভারতীয় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদল চীন সফরে গেলে তিনি বললেন, ‘চীন সহজেই কালাপানি দিয়ে ঢুকতে পারে।’ কালাপানি ভারতের উত্তরখণ্ড রাজ্যে পিথোরাগড়ের কাছাকাছি একটি জায়গা। এটা নেপালের সাথে একটি অচিহ্নিত সীমান্ত বরাবর অবস্থিত, যা একই সাথে চীনের ভূখণ্ডসংলগ্ন। অর্থাৎ তিন দেশের সংযোগস্থল এটি। ওই চীনা কর্তাব্যক্তি বলেছেন, চীন এমনকি কাশ্মির দিয়েও ঢুকে যেতে পারে। সেখানে ভারত-চীন-পাকিস্তান সীমান্ত রয়েছে।
সবাই চায় সমদূরত্ব বজায় রাখতে
সম্ভবত এ কারণেই এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকার ডোকলাম নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে নিজেদের জড়াতে চায়নি। নেপালের উপপ্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণবাহাদুর শাহারা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে বৈঠকের প্রাক্কালে বলে দিয়েছেন, সীমান্ত বিরোধের ইস্যুতে নেপাল এই পক্ষ বা ওই পক্ষ, কারো সাথে জড়িয়ে পড়বে না।’ সুষমা কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন বিমসটেক আঞ্চলিক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে। চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওয়াং ইয়াং কাঠমান্ডু আসছেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী শেরবাহাদুর দেউবা এর পরই দিল্লি সফর করবেন। এ দিকে শ্রীলঙ্কার একজন মন্ত্রী কলম্বোতে এক সম্মেলনে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার জন্য ভারত ও চীন, উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেদের লাইনমতোই কথা বলেছেন। তিনি ডোকলামের ব্যাপারে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য চীনকে দায়ী করলেন এবং ভারতের কোনো উল্লেখ তার বক্তব্যে ছিল না। ভুটানের মিডিয়ায় সে দেশের কলামিস্টরা ক্রমেই বেশি করে পরামর্শ দিচ্ছেন যেন ভুটান ভারত ও চীন, দুই দেশেরই অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।
ভারত এ অঞ্চলে অতীতে প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরা এখন এই যে, ‘সমদূরত্ব’ নীতি অনুসরণ করছে, এটা তা থেকে অনেক দূরের ব্যাপার। আর দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য এটা আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয় নয়। তবে গত কয়েক বছরে প্রতিবেশীদের প্রত্যেকেই (ভুটান ছাড়া) ধীরে ধীরে এ পথেই হাঁটছে। যখন মালদ্বীপ ২০১২ সালে অবকাঠামো সংক্রান্ত বেসরকারি গ্রুপ জিএমআর-কে মালে বিমানবন্দর উন্নয়নের চুক্তি থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলেছিল, তখন বলতে গেলে, কেউ ভাবতে পারেননি যে, চীনা কোম্পানিগুলো এখন মালদ্বীপের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যাপারে কাজ করার চুক্তিগুলো বাগিয়ে নেবে। এর মধ্যে আছে- একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের উন্নয়ন এবং রাজধানী মালের সাথে এর সংযোগ। সেই সাথে পর্যটনের জন্য আরেকটি দ্বীপ ৫০ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছে চীনাদের কাছে।
একইভাবে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ২০১৫-১৬ সালের শেষ দিকে যখন ট্রানজিট বাণিজ্য এবং অবকাঠামো নিয়ে চুক্তি করলেন চীনের সাথে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উঁচু কর্তারা এটা নিছক ‘ধোঁকাবাজি’ বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ এখন চীন নেপালে রেলপথ নির্মাণ করে দিচ্ছে, যা লাসা-কাঠমান্ডু সংযোগ স্থাপন করছে। নেপালের পোখরায় বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য চীন নেপালকে ‘নমনীয় ঋণ’ দেবে ২০০ মিলিয়ন ডলারের। নেপালের বিনিয়োগ বোর্ড জানায়, গত মার্চ মাসে দুই দিনব্যাপী বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনে চীনা বিনিয়োগকারীরা ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। ওই সম্মেলনে উপস্থিত সাতটি দেশের সবাই একত্রে নেপালে যত প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, চীন একাই দিচ্ছে তার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি।
শ্রীলঙ্কার হাম্মানটোটা বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ভারত প্রত্যাখ্যান করার পরই ২০০৭ সালে তা চলে যায় চীনের হাতে। আজ চীন বন্দরটির ৮০ শতাংশের মালিক তো বটেই, তদুপরি হাম্মানটোটা থেকে কলম্বো পর্যন্ত অবকাঠামোর সব কাজের জন্যই চুক্তি হয়েছে চীনের সাথে। গত বছর অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর এ ধরনের আরেক দৃষ্টান্ত। তখন বাংলাদেশের অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পগুলোর কাজে ২৪ বিলিয়ন ডলার দেয়ার ওয়াদা করেছে চীন। চলতি বছরের প্রথম দিকে চীনের প্রধানত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কনসোর্টিয়াম ‘হিমালয় এনার্জি’ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তিনটি গ্যাসফিল্ডের কাজ পেয়েছে। এত দিন এটা করত মার্কিন কোম্পানি ‘শেভরন’। বাংলাদেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি পাওয়া যাবে এগুলো থেকে।
যদিও পাকিস্তান এসব দেশের তালিকায় পড়ে না, এটা বোঝা কঠিন নয় যে, ভারতের লাগোয়া পড়শিরা কয়েক বছরের মধ্যেই কোন দিকে অগ্রসর হবে। এসব দেশের সবাই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ। আরো বড় বাস্তবতা হলো, একবার চীনা বিনিয়োগের স্রোত ঢুকতে শুরু করলে চীনের কৌশলগত অধিকতর উপস্থিতিকে এড়িয়ে যাওয়া দেশগুলোর জন্য আরো কঠিন হয়ে যাবে। এই উপস্থিতির ব্যাপারে চীনের এখন আর কোনো দ্বিধা নেই।
ডোকলামে ভারতের অ্যাকশনের একটি উদ্দেশ্য, ভুটানকে এমন অবস্থায় পড়া থেকে বাঁচানো। তাহলে চীনের বিআরআই-এর বিরোধিতায় ভারতের সমর্থক কোনো দেশে যাতে চীন বিশেষ সুবিধা না পায় তা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশকে ‘ফিরিয়ে আনা’র জন্য ভারতের অবশ্যকরণীয় কী?
সার্কের দিকে প্রত্যাবর্তন
সর্বপ্রথম ভারতকে সার্কের প্রধান চালিকাশক্তির ভূমিকা পুনরুদ্ধার করতে হবে। পাকিস্তানের সাথে সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারত এক বছর আগে দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা পরিত্যাগ করেছে। চার দিক থেকে যতই ব্যঙ্গবিদ্রুপের শিকার হোক না কেন, সার্ক তার প্রতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তিন দশক ধরে টিকে রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা। উরিতে হামলার জের ধরে ভারত পাকিস্তানে আয়োজিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করেছিল। বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো অন্য যেসব দেশ সন্ত্রাসবাদের শিকার, তারা তখন ভারতকে সমর্থন দিয়েছে। এ বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য হলেও এরপর এক বছরেও সার্কের প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করা দুর্ভাগ্যজনক। এতে দক্ষিণ এশিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বন্ধন আরো ঢিলা হয়ে যাবে। ফলে চীন এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের পথ পেয়ে যাবে আরো সহজে। মনে রাখা উচিত, চীন বারবার অনুরোধ করার পরও তাকে সার্কের সদস্য করা হয়নি। নরেন্দ্র মোদি সরকার উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক), বিমসটেক, বিবিআইএন, এই অঞ্চলের সবার জন্য নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধি প্রভৃতি নামে ও উদ্দেশ্যে সার্কের বিকল্প ফোরাম গড়ায় তৎপর। কিন্তু এর কোনোটাই শক্তি ও সর্বাঙ্গীণতার দিক দিয়ে সার্কের ধারেকাছেও আসতে সক্ষম নয়।
দ্বিতীয়ত, ভারতকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতে সে কোনো পক্ষ নিলেও এসব দেশে চীনের সাফল্যের মাত্রায় হেরফের হবে না। শ্রীলঙ্কায় সিরিসেনা সরকার চীনের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু করেনি। পূর্ববর্তী রাজাপাকসে সরকার দেশকে ঋণের জালে আবদ্ধ করে গেছে, ক্ষোভের সাথে এ কথা বারবার বলেও বর্তমান সরকার এই ঋণ শোধের কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আরো ঋণের জন্য চুক্তি সই করেছে। মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে অপসারণের সময় ইউপিএ সরকার একই রকম ভুল করেছে। পরের সরকারগুলো সে দেশে চীনা প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেনি।
ভারত নেপালের কেপি শর্মা ওলি সরকারের সময় তার ব্যাপারে সুস্পষ্ট উদ্বেগ জানিয়েছিল। ২০১৬ সালে ভারত তাকে হটিয়ে পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্দকে ক্ষমতায় আসীন হতে সাহায্য করছে- এমন অভিযোগও ওঠে। তবুও নেপাল তার দুর্গম ভূখণ্ডের উন্নয়নে চীনের অবকাঠামো আর বাণিজ্যসহায়তা নিতে অধীর আগ্রহ কমায়নি। বিগত দশকে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা দিল্লির সাথেই ঘনিষ্ঠতম বন্ধন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনিও চীনের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করে তুলেছেন। আগামী নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগ হেরে গেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াকে অনেক এগিয়ে নেবে তা নিশ্চিত। আগামী বছর ভুটানেও নির্বাচন। ভারতের এতে কোনো পক্ষ না নেয়াই প্রয়োজন। কারণ, ডোকলাম ইস্যু ভারত বনাম চীন নির্বাচনী ইস্যু হওয়ার চেয়ে মন্দ কিছু হতে পারে না।
মর্যাদার নীতি
সর্বোপরি ভারতকে এটা স্বীকার করতে হবে, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন মানে সে দেশে বেশি বিনিয়োগ কিংবা তাকে অবাঞ্ছিত সুযোগ দেয়া নয়। এটা হলো পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার নীতি। এ দিক দিয়ে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে সে ভালো অবস্থানে রয়েছে।হ
লেখিকা : ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক ( নয়া দিগন্ত )
Powered by Blogger.