Header Ads

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাবার সংকট, খোঁজ নেই সাহায্য সংস্থার

টানা দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল অব্যাহত থাকলেও এখনো তাদের কাছে ন্যূনতম পর্যায়ের ত্রাণ সরবরাহ শুরু করতে পারেনি সাহায্য সংস্থাগুলো। খাদ্য ও আশ্রয় সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গম এলাকা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও প্রায় একই।
শরণার্থীদের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃত জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর কর্মকর্তারা বলছেন, দুঃসহ এ পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পাওয়ার পরই তারা প্রয়োজনীয় ফান্ডের জন্য সদর দফতরে আবেদন করবেন। অথচ ইউএনএইচসিআরসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উনছিফ্রাং এলাকায় দেখা যায়, একটি প্লাস্টিকের নিচে পরিবারের ছয় সদস্যসহ নিজেদের বৃষ্টি থেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন মডুর কলিমুল্যা।
পরিবারটির সম্বল বলতে এ প্লাস্টিক, যার নিচে তারা আশ্রয় নিয়েছেন। সকালে চিড়া এবং রাতে কয়েকটি বিস্কুট আর পানি খেয়ে দিন পার করেছে পরিবারটি।
পরিবর্তন ডটকমকে কলিমুল্যা বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে আমরা এখানে আছি। স্থানীয়রা কিছু খাবার দিলেও আর কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি।’
বৃষ্টি থেকে নিজদের রক্ষার জন্য একটুকরো প্লাস্টিকও জোটেনি ছালামের পরিবারে। আট সদস্যের এ পরিবারে রয়েছে ছোট ছোট তিন শিশু। যাদের পরনে নেই কোনো কাপড়। অন্ধকার রাতে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে রাস্তার ওপর বসে আছে উলঙ্গ শিশুসহ ছালামের পরিবার।
ছালাম বলেন, ’১২ দিন আগে রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থেকে হাঁটা শুরু করেছি বাংলাদেশের পথে। এ কয় দিন যেন নরকের মধ্য দিয়ে হেঁটে এসেছি।’
এদিকে বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আসা রোহি্ঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি। এরা অবস্থান নিয়েছে ইউএনএইচসিআর নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পসহ সীমান্ত এলাকার মোট ২০টি স্থানে। কিন্তু সবখানেই আশ্রয়হীনতা আর খাবার সংকটে ভুগছেন তারা।
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা জানালেন, ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ কিছু কিছু খাবার সরবরাহ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একবারেই অল্প। এখানকার শরণার্থী দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘খাবার কখনও পাই কখনো পাই না। তাই এই শিবির ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো ইউএনএইচসিআর ক্যাম্পেই কেন খাবারের এ হাহাকার—জবাবে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মুখপাত্র ভিভিযান তান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এতো বেশি শরণার্থী আসছে যে, আমরা হতভম্ব হয়ে পড়েছি। তবে এ পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুমান করার পর প্রয়োজনীয় ফান্ড সরবরাহের অনুরোধ জানানো হবে।’
খাবার বিতরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পুরানো রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে এ ক্যাম্পে সদ্য আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। আমাদের স্টাফরা এটা মনিটরিং করে থাকেন।’
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ঢাকা অফিসের গণসংযোগ কর্মকর্তা মাহারিন খান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার রোহিঙ্গাকে হাই এনার্জি বিস্কুট এবং দৈনিক এক বেলা করে খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মাসে পরিবার প্রতি ৫০ কেজি করে চাল প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
বর্তমানে সাহায্যের আশায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। একটু খাবার ও পানির আশায় হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন পথচারী ও আগন্তুকের দিকে। স্থানীয়রা তাদের যতটুকু সম্ভব সাহায্য দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ইউএনএইচসিআর এর দুটি ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে সদ্য আসা প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা।
এদিকে টেকনাফ উপজেলার হেয়াইক্যাং ইউনিয়নের রাইখ্যাংয়ের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন কমপক্ষে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা।
এখানকার রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, সেখানে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম তিন হাজার প্লাস্টিক বিতরণ করেছে। এ ছাড়াও বিজিবির সঙ্গে এ সংস্থাটি একাধিক মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছে।
শরণার্থী আবু আলম বলেন, ‘এ এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। কোনো মতে একটা আশ্রয় বানানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু খাবারতো পাচ্ছি না। স্থানীয়রা যা দেয় তা খেয়েই কোনো মতে দিন পার করছি।’
এ ছাড়াও এ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ক্লাব ও খোলা স্থানে আছেন আরো কয়েক হাজার রোহিঙ্গা। তারা বলছেন, সাহায্য দেওয়া তো দূরের কথা, গণনা করার জন্যও কোনো সংস্থার লোকজনকে এখানে দেখা যায়নি।
গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।
এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার গানশিপের ব্যাপক ব্যবহার করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে মিয়ানমার সরকারের হিসাবে ৪ শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে এসেছেন।
মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নে ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় পৌনে দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এ সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
Powered by Blogger.