Header Ads

ভারতের কূটনৈতিক অন্দরমহলে মারাত্মক দ্বন্দ্ব!

ডোকলাম নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যকার অচলাবস্থার নিরসন হয়েছে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সঙ্কটটির নিরসন হওয়ায় স্বস্তি নেমে এসেছে। কিন্তু কিভাবে হলো এই সমাধান? এ নিয়ে কলকাতাভিত্তিক আনন্দবাজার পত্রিকার একটি ভাষ্য তুলে ধরা হলো।
ডোকলাম নিয়ে শুরুতে যুদ্ধং দেহি মনোভাব নিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। কিন্তু তাতে কূটনৈতিক জটিলতা আরো বেড়ে যায়। তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে হাল ধরেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কথায়, ‘‘প্রথমেই চীন দশ গোল দিয়ে দিয়েছিল। পরে জয়শঙ্করের নেতৃত্বে কূটনৈতিক পথে খেলাটাকে ড্রয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া গিয়েছে।’’
এই পরিস্থিতিতে অজিতের ডানা ছেঁটে জয়শঙ্করকে পররাষ্ট্রনীতির বিশেষ উপদেষ্টা করার কথা ভাবা হচ্ছে। তখন শুধু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দেখবেন অজিত ডোভাল। জয়শঙ্কর দেখবেন বিদেশনীতি ও বৈদেশিক নিরাপত্তার বিষয়টি। পররাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে জয়শঙ্কর অবসর নিচ্ছেন ২৯ জানুয়ারি। নতুন পররাষ্ট্র সচিব হবেন বিজয় কেশব গোখলে। বর্তমানে যিনি চীনে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করছেন।
ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে গোখলে ও জয়শঙ্কর জুটি বিদেশনীতির ক্ষেত্রে আরো সক্রিয় ভুমিকা নেবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ডোকলাম নিয়ে উত্তেজনা আপাতত কমানো গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি চীন সফরে যাচ্ছেন। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সীমান্ত বিতর্ক নিয়ে কথা হবে তার। কিন্তু এ মুহূর্তে সাউথ ব্লকের অন্দরে চলছে অজিত ডোভাল বনাম জয়শঙ্করের বিরাট বিবাদ।
সাউথ ব্লকের একটি সূত্র বলছে, কট্টরবাদী ডোভাল এখনো মনে করেন, তিনি ‘পেশিশক্তি’ প্রদর্শনের নীতি নেয়াতেই চীনকে কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় আসতে বাধ্য করা গিয়েছে। আর জয়শঙ্কর শিবির বলছে, চীনকে চেনা এত সহজ নয়। ভুটান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাকে নিজেদের উপনিবেশ ভেবে একতরফা অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলা হয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে তবু ‘জেমস্ বন্ড’ মনোভাব নেয়া যায়। চীনের সঙ্গে তা করতে গিয়ে মূল্য চোকাতে হয়েছে অনেকটাই।
প্রথমত, ভুটানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অনেকটাই অবনতি হয়েছে। আগামী দিনে সেটা পুনরুদ্ধার করতে হবে। ভুটানের এক দিকে চীন, অন্য দিকে ভারত। চীন কখনো ভুটানের ভূখণ্ড দখল করলে যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটা থিম্পুর কাছে কাম্য নয়। ভুটান তাই প্রথম থেকেই দু’পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে।
দ্বিতীয়ত, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, এমনকী, বাংলাদেশের সঙ্গেও চীন দ্রুত সম্পর্ক স্থাপন করছে।
তৃতীয়ত, ডোকলাম-সঙ্কটের মধ্যেই অশান্ত দার্জিলিঙে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের প্রতি সিকিমের সমর্থন কেন্দ্রের ভ্রূকুটির কারণ হয়ে ওঠে। বেগতিক বুঝে মোদি পথ পাল্টান। তার নির্দেশে চীনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিজয় গোখলেকে নিয়ে কূটনৈতিক দৌত্যে নামেন জয়শঙ্কর। শুরু হয় ‘ট্র্যাক-টু’ কূটনীতি। বারবার আলোচনা করে চীনকে বোঝানো সম্ভব হয়, যে ভারত সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু চীন যেন ডোকলামে রাস্তা নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখে।
এই কাজে সফল হতে জয়শঙ্করের কৌশল ছিল, চীন যতই আক্রমণাত্মক হোক না কেন, ভারত প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। এমনকী, চীনা ভিডিওতে যখন ভারতের ভূমিকা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ শুরু হয়, তখনও মুখে কুলুপ এঁটে ছিল ভারত। প্রথম পর্বে ভারতের সেনাপ্রধান এবং বিভিন্ন মন্ত্রী প্রকাশ্যে চীন সম্পর্কে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করছিলেন। জয়শঙ্করের পরামর্শ মেনে প্রধানমন্ত্রী সকলকে চুপ করতে বলেন। দশ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ ড্র হয় শেষ পর্যন্ত।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে কি অবস্থান নেবে ভারত?
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর যখন বিপুল সংখ্যায় রোহিঙ্গারা সেদেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসছেন, সেই সময়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে মিয়ানমার যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার শুরু হতে চলা ওই সফরে রাখাইন প্রদেশের সহিংসতা ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়েও আলোচনা হবে ভারত আর মিয়ানমারের মধ্যে।
তবে ভারত বলছে, নিরাপত্তা ও মানবিকতার ইস্যুগুলি তোলার সঙ্গেই তারা রাখাইন অঞ্চলে সামাজিক উন্নয়নের ওপরেও জোর দিচ্ছে।
ভারতে চলে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছেন, এরকম সহিংসতা বন্ধে নরেন্দ্র মোদী জোরালোভাবে মিয়ানমারের সংখ্যালঘুদের সমর্থনে এগিয়ে আসুন এটাই তারা চান।
রাখাইনের সহিংসতা স্বাভাবিক ভাবেই আন্তর্জাতিক মহলেরও নজরে পড়েছে, তাই প্রতিবেশী দেশ হিসাবে এবং মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র হওয়ার কারণে এ বিষয়ে ভারতের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা মানছেন সবাই।
এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন বলছিলেন, “সম্প্রতি যে সহিসংতা চলছে, তখনই আমাদের তরফে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে – সঠিক তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কোফি আনানের নেতৃত্বেও একটি কমিটি তাদের অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট পেশ করেছে – অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সেখানে রয়েছে, সেগুলি মিয়ানমার গুরুত্ব দিয়েছে বিবেচনা করছে বলেই আমাদের তারা জানিয়েছে। এই সফরে রাখাইন প্রদেশের সমস্যা সমাধানে ভারত আরও কি কি সাহায্য করতে পারে, সে ব্যাপারে আলোচনা হবে।”
তিনি আরও জানান যে রাখাইন প্রদেশের সমস্যার যেমন নিরাপত্তার দিকটি আছে, তেমনই রয়েছে মানবিকতার ইস্যু ও সামাজিক উন্নয়ন।
“কোনো বিষয়ই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু ভারত চেষ্টা করছে ওই অঞ্চলের সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে সমস্যার সমাধানের। অনেকগুলি প্রকল্প ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলে চলছে” – জানাচ্ছিলেন বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব।
তবে ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা চাইছেন মিয়ানমারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ নিয়ে জোরালোভাবে এই সফরে আলোচনা করুন নরেন্দ্র মোদি।
রোহিঙ্গা শরণার্থী আলি জোহর ১১ বছর বয়সে দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। বছর সাতেক বাংলাদেশে থাকার পরে এখন থাকেন দিল্লিতে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে।
মি. জোহরের কথায়, “ভারতের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত এই সহিংসতা বন্ধে। মিয়ানমারের সরকার চায় এটাকে জাতিগত হিংসা বলে দেখাতে, কিন্তু ভারতের উচিত এটাকে আঞ্চলিক বিবাদ বলে আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে বিষয়টিকে তুলে ধরা। মি. মোদীর এই সফরের দিকে সেখানকার সংখ্যালঘুরা তাকিয়ে আছে – আশা করছে সবাই যে তিনি শুধু রোহিঙ্গা নয়, মিয়ানমারের সব সংখ্যালঘুদের পক্ষ নিয়েই সেদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।”
নরেন্দ্র মোদীর এই সফরের আগেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে। শরণার্থীদের ব্যাপারে যে ভারতের নীতির কোনো বদল এখনো হচ্ছে না, সেটা জানিয়েছেন বিদেশ দপ্তরের যুগ্ম সচিব।
ভারতে এখন গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকেন। যার মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের পরিচয়পত্র পেয়েছেন ১৬৫০০ জন। শ-পাঁচেক রোহিঙ্গা বিভিন্ন জেলে রয়েছেন অনুপ্রবেশের দায়ে।
শরণার্থীদের যাতে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানো হয়, তার জন্য একটি মামলা দায়ের হয়েছে সুপ্রীম কোর্টে – যার শুনানী রয়েছে আগামী সোমবার।
শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করছেন আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারত সরকার অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো কথা বললেও সহজে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
নয়া দিগন্ত
Powered by Blogger.