Header Ads

ভয়াবহ অবস্থা ঃ এক ক্যাম্পেই ৭০,০০০ রোহিঙ্গা !

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মৃত্যুকূপ থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে প্রতিদিন। শুক্রবারও এসেছে কয়েক হাজার। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু কোথায় হবে তাদের আশ্রয়? আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ইউএনএইচসিআর বলছে কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে নিবন্ধিত ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা থাকার কথা থাকলেও এখন আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সরজমিনেও এমন চিত্রই দেখা গেছে। টেকনাফ রোড সংলগ্ন উখিয়া কুতুপালং ক্যাম্পের আশপাশে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়েছে। পুরো সড়ক জুড়েই তাদের অবস্থান, খোলা আকাশে নিচে। পরিস্থিতি এমন প্রশাসনের লোকজন তাদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। কুতুপালং এলাকা যেন একটি ‘মানব বোমা’য় পরিণত হয়েছে। যে কোন মুহূর্তে এখানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। টেকনাফ সড়কে থাকা অনিবন্ধিত হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নিতে কাজ করছিলেন উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন। কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি জানান কুতুপালং এর নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে কোনো অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিককে (রোহিঙ্গা) রাখতে চান না তারা। এজন্য ওই ক্যাম্পের পাশে ২ হাজার একর জমি অ্যাকুয়ার করে নতুন অস্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তিনি জানান এটি দ্রুত না করা গেলে রেহিঙ্গারা গোটা কক্সবাজার ও আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওদিকে জেনেভা থেকে প্রচারিত ইউএরএইচসিআর-এর বিবৃতিতে মিয়ানমারের রাখাইনের চলমান সহিংসতা থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভায়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে গত ২ সপ্তাহ ধরে চলা ওই সহিংসতা থেকে প্রাণে বাঁচতে এবং নিরাপত্তা পেতে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তারা যেসব ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে তা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এ অবস্থায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা খোলা আকাশের নিচে।
ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র দুনিয়া আসলাম খান মিয়ানমার সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন রোহিঙ্গা সংকট এবং চলমান সংহিসতার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে, যাতে তাদের বাস্তুচ্যুত হতে না হয়। একই সঙ্গে যারা এরইমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, পালিয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের বসত বাড়িতে ফিরতে পারে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক ওই সংস্থার বর্ণনা মতে উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় বিভিন্ন সড়কে পাশে রোহিঙ্গারা ব্যাঙের ছাতার মতো (মাশরুম) আশ্রয় নিয়েছে। এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক হলেও তাদের নাগরিত্ব কেড়ে নিয়ে আজ ‘রাষ্ট্রহীন’ বানানো হয়েছে। মিয়ানমারে তাদের মৌলিক মানবাধিকার নেই। মুক্তভাবে চলাচলের স্বাধীনতা নেই। সামাজিক, নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার তো নেই-ই। গতকাল কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেয়া এলাকা পরিদর্শনে এসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সবাইকে যথাযথ সহযোগিতা করা হবে।
ওদিকে বৃটিশ পার্লামেন্টের তরফে রোহিঙ্গাদের উপর চালানো মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বর্বরতাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে। ইউকে পার্লামেন্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বৃটেনের ওয়েল্‌স থেকে নির্বাচিত এমপি ফাহমিদা খন্দকার লিখেছেন মিয়ানমারে শান্তিতে নোবেল জয়ী একজন নেত্রী গণহত্যা চালাচ্ছেন। আর বিশ্বসম্প্রদায় অত্যন্ত নীরবতার সঙ্গে সেটি দেখছে। তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন সেসব দেশ মিয়ানমার সেনাদের সমর্থন দিচ্ছে আমরা তাদের নাম জানি। দয়া করে তাদের সমর্থন দেয়া বন্ধ করুন। তিনি বলেন, আমরা জানি একজন নিরীহ লোককে আঘাত বা আক্রান্ত না করেও কিভাবে সন্ত্রাস দমন করতে হয়। দয়া করে আমাদেরকে বলতে আসবেন না যে আপনারা গণহত্যা করে সন্ত্রাস দমন করছেন! বৃটিশ পার্লামেন্টের অনেক এমপি এ গণহত্যার নিন্দা করেছেন। তারা অং সান সু চি’র প্রতি এটি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ বলছে মিয়ানমারের ওই গণহত্যায় প্রায় ৩ লাখ লোক বাস্তচ্যুত হয়েছে। তাদের ধারণা এর বেশির ভাগই বাংলাদেশে ঢুকেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাতে ঢাকা যে তথ্য পেয়েছে তাতে দেখা গেছে ওই গণহত্যায় প্রায় ৩ হাজার নিরস্ত্র লোকের প্রাণ গেছে।
তাদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ চালিয়েছে বর্মী সেনা ও তাদের সহযোগীরা। বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে। কেবল রোহিঙ্গা মুসলিম নন, অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোকেরাও জাতিগত এ সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফে মিয়ানমারের প্রতি শুরু থেকে এমন সহিংসতা বন্ধের জোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কক্সবাজার শহরে ঢুকছে রোহিঙ্গারা, ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম পর্যন্ত: এদিকে সরজমিন এবং স্থানীয় বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে রোহিঙ্গারা এখন আর টেকনাফ বা উখিয়ায় নেই। তারা কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে বসতি গড়ে তুলছে। স্থানীয়রা তাদের সহায়তা করছে। কক্সবাজার পৌরসভার মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসন এ পর্যন্ত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার শহর ও শহরতলীতে বসতি গেড়েছে বলে তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এ নিয়ে শুক্রবার থেকে বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথাও জানায় স্থানীয় প্রশাসন। অবশ্য প্রশাসনের এমন উদ্যোগের সত্যতাও পাওয়া যায় সরজমিনে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম টেকনাফ সড়কের উখিয়া কোর্টবাজার সংলগ্ন এলাকায় বিজিবি নিয়ে শহর অভিমুখী রোহিঙ্গা বহনকারী যানবাহন ঠেকানোর কাজ করছিলেন। ঘটনাস্থলেই কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা রোহিঙ্গাদের টেকনাফ ও উখিয়াতেই রাখতে চাই।
কিন্তু তারা দলে দলে শহরের দিকে ছুটছে। এটি ঠেকাতেই আমাদের এই অভিযান। ওই প্রতিবেদকের সামনেই বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা বোঝাই গাড়ি টেকনাফের দিকে ফিরিয়ে দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। উল্লেখ্য, দক্ষিণ চট্টগ্রামে রোহিঙ্গারা ঢুকছে এমন খবর চাউর হওয়া পর নড়ে চড়ে বেসেছে স্থানীয় প্রশাসন। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, আমরা সতর্ক আছি। বিচ্ছিন্ন ভাবে দু’-একটি পরিবার ঢুকতে পারে। কিন্তু বড় আকারে প্রবেশের কোনো তথ্য এখনও পাইনি। প্রেস ক্লাব সভাপতিও এমনটিই জানান। বলেন- প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ৫ লাখ ডলার সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। ইউএনএফপিএ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য এক কোটি ১৩ লাখ ডলার সহায়তা চেয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে।
মানবজমিন
Powered by Blogger.