Header Ads

পাকিস্থানের স্বাধীনতা দিবসে মুফতি ফজলুর রহমান সাহেবের ঐতিহাসিক ভাষণ, কেন পাকিস্থান ইসলামী রাষ্ট্র হয়নি ?

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্থানের সভাপতি। পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী আলেম রাজনীতিবিদ। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন।
উপস্থিত জামিয়ার সম্মানিত শায়খ মুফতি আব্দুর রহিম, জামিয়ার শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা!
আগেও বেশ ক’বার আমি জামিয়াতে এসেছি। যখনি আমি হাজির হয়েছি জামিয়ার পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আজ প্রথমবারের মতো ডকুমেন্টারির মাধ্যমে জামিয়ার বিশাল কার্যক্রমের উপর আমাকে আরও কিছু ধারণা দেয়া হলো। জামিয়ার কার্যক্রম, গৃহীত নতুন কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আমার আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুফতি সাহেবের সাথে আমার সাক্ষাৎ অনেক হয়েছে এবং নিয়মিত হয়ে চলেছে। তাঁর চিন্তাধারা থেকে আমার কার্যক্রম অনেক শক্তি পায়। দোয়া করি, আমরা যেন এই ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা এবং যার যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই দীন ইসলাম ও তার তালিমের কাজ আরও এগিয়ে নিতে পারি।
শিক্ষার বুনিয়াদি শর্ত এমন একটা পরিবেশ, যেখানে নির্বিঘ্নে শিক্ষা অর্জন করা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলাই হয় তাকে, যেখানে শুধু পাঠ দান ও পাঠ গ্রহণের কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়। যদি শেখা-শেখানোর কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ সেখানে যুক্ত হয়, তবে তাকে আর যাই বলা হোক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। অথচ গত কয়েক বছর যাবত বিশেষ একটা পরিস্থিতি তৈরি করে আমাদের মাদরাসাগুলোকে এই নীতি থেকে বিচ্যূত করার চষ্টা করা হচ্ছে।
আলেম সমাজ যেন সন্তোষজনক শিক্ষা-পরিবেশ পায় এবং তাদের সবটুকু ইলম অর্জনে নিয়োজিত হয়, সংশ্লিষ্ট সবাই যেন ইলম অর্জনে ব্রতী হয়, সেজন্য শিক্ষাপরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা ছিলো বড় কঠিন কাজ।
অন্য দিকে দেশীয় বা আন্তর্জতিক যে চক্রগুলো দীনী মাদরাসার কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে কিংবা যারপরনাই কমিয়ে ফেলতে মরিয়া, তাদের অভিসন্ধি ব্যর্থ করে দেয়াও ছিলো কঠিন কাজ। একই সঙ্গে এই উভয় ময়দানে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামকে কাজ করতে হয়েছে। এজন্য প্রথমে সমস্ত মাদরাসা ও সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা অর্জনের কঠিনতম অধ্যায় পার করতে হয়েছে। কালের এ সঙ্কটময় পরিস্থিতি আমরা অতিক্রম করেছি। এখনো করে যাচ্ছি। আমাদের মূল কথা ছিলো পরিস্থিতি যেমনই হোক, মাদরাসাগুলোতে লেখাপড়ার পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।
আরেকটি বিষয়ে বলতে ইচ্ছে করছে এবং এ ক্ষেত্রে আমি জামিয়ার নির্দেশনা পাওয়ার আশা করি। দীনী মাদরাসায় পঠন-পাঠনে নিযুক্তরা ধর্মীয় জ্ঞান এবং ইসলামি আদর্শ ও চিন্তাধারার ধারক-বাহক। সুতরাং এই দেশে শরিয়া আইন চালু হোক এটা তাদের সুদৃঢ় আস্থা এবং আন্তরিকতাপূর্ণ দাবী।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু পঠন-পাঠনের দ্বারা শরিয়া আইন চালু হবে না। এজন্য আমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত হতে হবে, যারা বর্তমানে রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশিদার, এখন যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল শাখার চাহিদা পূর্ণ করচ্ছে।
সরকার নিয়ন্ত্রিত স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি এবং ইনস্টিটিউটগুলোতে বিশেষ কারিকুলামে ট্রেনিং করানো হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল বিভাগ সামলানোর মতো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে সেখানে। আমরা যখন কুরআন-সুন্নাহ ও শরঈ মূলনীতি অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যয় পোষণ করি, তখন আমাকে ভেবে দেখতে হবে, আমার তালিম-তরবিয়তের মাঝে রাষ্ট্রের সকল বিভাগ চালানোর ও সামলানোর মতো দক্ষ লোক তৈরির সুযোগ আছে কি না?
যদি সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হওয়ার পর আমাদের কাছেই ভিড়তে দেয় না। সবকিছু তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী পরিচালনা করে।
ভেবে দেখুন! একদিকে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা অর্জনের কোনো প্রস্তুতি নেই, অন্যদিকে যাদের প্রস্তুতি আছে, তারা আমদের বক্তব্য শুনতে প্রস্তুত নয়। তাহলে শরিয়া বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব? এভাবে চললে, এক সময় দক্ষ কর্মী বাহিনীর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সাধ্যের বাইরে চলে যাবে।
প্রশ্ন হতে পারে, আকাবির ও আসলাফ থেকে আমরা যে নেসাব ও নেজাম পেয়েছি, তা বহাল রেখে তার সাথে জাগতিক বিদ্যার সমন্বয় হবে কিভাবে?
প্রত্যের যুগের স্বতন্ত্র একটা চাহিদা থাকে। আজকের দীনী মাদরাসাগুলো ১৮৫৭ সনের আগে ছিলো না। উপমহাদেশ বা তার বাইরে কোথাও এই ধরনের মাদরাসা ছিলো না। তাহলে কী কারণে এ অঞ্চলে এমন জাতীয় মাদরাসা কায়েম করতে হলো? দেওবন্দে কেন মাদরাসা খুলতে হলো?
এটা ছিলো ঐ সময়ের দাবি ও চাহিদা। যদি মাদরাসার এ ব্যবস্থাপনা গড়ে না উঠতো, তাহলে আমাদের মাঝে কুরআন-সুন্নাহর নাম-নিশানও বাকি থাকতো না। আমাদের অবস্থাও হতো আন্দালুস আর গ্রানাডার মতো। দুনিয়াতে এমন অনেক নজির আছে, যেখানে মুসলমান নামসর্বস্ব, যারা ‘ইসলাম’ শব্দটাও শুনতে ভয় পায়। নিজেদের দীনের সাথে যাদের ন্যূনতম পরিচয় নেই।
তো আমাদের নেসাবের সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের সমন্বয় করা এবং রাষ্ট্রের সকল বিভাগের জন্য যোগ্য ব্যক্তি তৈরি করা সময়ের এক মৌলিক প্রয়োজন। আপনি কি (ইসলামী রাষ্ট্র-কাঠামো থেকে) আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে দীন ও শরিয়ত থেকে আলাদা ভাবতে পারেন? (ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা এই দৃষ্টিকোণ থেকে) একটা ‘দীনী ইলম’ আরেকটা ‘দুনিয়াবি ইলম’ এই বিভাজনটা কি আশ্চর্যজনক নয়!
অথচ ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দুটোই জরুরি ইলম! কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনি আদমকে সমস্ত নামসমূহ শিক্ষা দিয়েছেন।’ সকল সৃষ্টির উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হলো ইলম, আল্লাহ তাকে খেলাফতের আসন দান করেছেন ইলমের ভিত্তিতে। সুতরাং মানুষের সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার মতো দক্ষতা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করা আবশ্যক। আমরা সবাই শুধু দীনী ইলম শিখে অনেক বড় নেক্কার হতে পারি, এর মাধ্যমে ফেরেশতার মাকাম; বরং তারও উঁচু স্তরে উঠে যেতে পারি, কিন্তু শুধু দীনের ইলম শিখে খেলাফতের হকদার হতে পারবো না। খেলাফতের হকদার হতে হলে আমাদের মাঝে উভয় ইলমের সমাবেশ ঘটাতে হবে, আমাদের মাঝে উভয় জ্ঞানের জ্ঞানী থাকতে হবে।
এই সমন্বয়টা কিভাবে হবে? কিছুদিন আগেও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছিলো। সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা ও ফর্মুলা নিয়ে তারা কথা বলছিলো। আমি বললাম, দেখুন, আমাদেরকে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর দরকার নেই। আমরা নিজেরাই সমন্বয়ের প্রয়োজন অনুভব করি। আমরা যখন রাষ্ট্রের কর্ণধার হতে চাই, যার জন্য আমরা সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, তখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের নিজেদেরকেই প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে, এর সাথে কিভাবে আমরা নিজেদেরকে খাপ খাওয়াবো তার ফিকির করতে হবে। থাকতে হবে নিজস্ব জনবল। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা আমাদের কাছে নেই। সুতরাং প্রয়োজন আমরা স্বীকার করি।
Powered by Blogger.