Header Ads

আমি বেচেঁ আছি দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে হবে'

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরপরই দেশবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটাতে নিজের সুস্থ থাকার বিষয়টি জানাতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভেবেছিলেন, দেশবাসী তার কণ্ঠ শুনতে পেলে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর হবে। তাদের মনোবল চাঙ্গা হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বেচেঁ আছি দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে হবে।’ এই ব্যাকুলতা থেকেই তিনি ওইদিন রাতেই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন।
সাক্ষাতকার দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সেদিন সুধাসদনে উপস্থিত দলের নেতাদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী দিশেহারা। এক মুহূর্তও আমাকে দেরি করা ঠিক হবে না। আমি বেঁচে আছি, ভালো আছি দেশবাসীকে তা জানাতে হবে। না হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে পারে। দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। ওই সময়ে সুধাসদনে থাকা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপাল বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানান। তারা ওই সময়ে শেখ হাসিনার খুব কাছাকাছি ছিলেন।
তারা জানান, বিবিসি’র পক্ষ থেকে সাক্ষাতকার নিতে চাইলে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল প্রথমে তাদের না করে দেন, নেত্রীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে। পরে শেখ হাসিনার ইচ্ছায়ই ওই সংবাদ মাধ্যমকে ডেকে সাক্ষাতকার দেওয়া হয়।
এই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২১ আগস্ট ঘটনার পর সুধা সদনে বসে আব্দুল জলিল বলেছিলেন, ‘নেত্রী, বিবিসি থেকে আপনার সাক্ষাতকার নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি নিষেধ করে দিয়েছি।’ শেখ হাসিনা তখন বলেন, না, আমি সাক্ষাতকার দেবো!’
তখন আব্দুল জলিল বলেন, ‘নেত্রী আপনি আহত। এ মুহূর্তে আপনার কারও সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তাও স্পষ্ট নয়।’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকেই যাক গণতন্ত্রের স্বার্থে, শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে আমাকে কথা বলতে হবে। আমি বেচেঁ আছি দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে হবে।’
পরে শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছার কারণে আব্দুল জলিল বিবিসি’র সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লন্ডন বিবিসি অফিস থেকে শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। 
জানা যায়, আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে, শেখ হাসিনা কোথায় আছেন সেই সন্ধান কাউকে জানানো যাবে না। তাদের ভেতরে তখনও বিপদের আশঙ্কা কাজ করছিল। সবাই দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলেন। কখন কী ঘটে। তাই নেত্রীর প্রকৃত অবস্থান ও অবস্থা জানানো উচিত হবে না। অবস্থা বুঝে পরে শেখ হাসিনা কেমন আছেন, তা নেতাকর্মীসহ পুরো দেশবাসীকে অবহিত করা হবে- এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নেতারা।
কিন্তু গুরুতর আহত শেখ হাসিনা তখনও দেশের কথা, গণতন্ত্রের কথা, অনিবার্য সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা করে বিচলিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় নিজের সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করতে মোটেও দেরি করেননি তিনি।
২১ আগস্ট সুধাসদনে শেখ হাসিনার ব্যাকুলতার কথা তুলে ধরে ড. প্রাণ ঘোপাল দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি পেশায় ডাক্তার হলেও সেদিন একজন ভালো রাজনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিক শেখ হাসিনাকে জেনেছি।’ সেদিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে দেশবাসীর ভেতরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী দিশেহারা। এক মুহূর্তও আমাকে দেরি করা ঠিক হবে না। আমি বেঁচে আছি, ভালো আছি, দেশবাসীকে তা জানাতে হবে। না হয় গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে পারে। দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। আমি এটা হতে দিতে পারি না।’
ওইদিন শেখ হাসিনার অবস্থানের কথা জানিয়ে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘‘২১ আগস্টের পরে নেত্রী আমাদের সবাইকে ডেকে শুধু এটুকু বলেছেন, ‘তোমরা সবাই হাসপাতালে যাও। কে কোন হাসপাতালে আছে, কার অবস্থা কেমন দেখে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করো। আর আমাকে তথ্য দিয়ে আপডেট রাখো।’ নেত্রী কিছুক্ষণ পর পরই খোঁজ নিতেন- আমাদের কাছ থেকে আহত কার অবস্থা কেমন।’’
খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘নেত্রীকেও গুরুতর আহত দেখেছি। কান দিয়ে রক্ত পড়ছে। কিন্তু নিজের চিকিৎসার ব্যাপারে কোনও উদ্যোগই গ্রহণ করেননি শেখ হাসিনা। ’
দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা যখন আহত শেখ হাসিনার চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বিদেশে পাঠাতে ও বিশ্রামে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত, শেখ হাসিনা তখন হতাহত নেতাকর্মীদের অবস্থা জানতে ব্যাকুল। নিজের পরিচিত সব ডাক্তার ও দলের সব নেতাকর্মীকে তিনি ঢাকা মেডিক্যালে এবং রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
আগস্ট মাস জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের জন্যে আতঙ্কের মাস। ১৯৭৫ সালে এ মাসেই বাঙালির মুক্তির নায়ক, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছিল। ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের আগস্ট মাসেই বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হয়েছিল।
শেখ হাসিনার প্রাণনাশের জন্যে ২১ আগস্ট বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের হামলায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। সেদিনের আর্জেস গ্রেনেডের হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা। 
শেখ হাসিনা ট্রাকমঞ্চ থেকে সবে নামতে যাবেন, এমন মুহূর্তে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। থেমে যায় সব কোলাহল। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিছিলের কর্মসূচি সন্ত্রাসের শিকার হয়। লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা।
উৎসঃ   banglatribune
Powered by Blogger.