Header Ads

বঙ্গবন্ধুর সই করা সংবিধান ‘আমরা’ দিয়ে শুরু হয়েছিল

ষোড়শ সংশোধনীর রায় অবৈধ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক চলছে, তার পটভূমিতে সংবিধানপ্রণেতাদের অন্যতম এবং ওই মামলার একজন অ্যামিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো: ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে চলমান বিতর্ককে কীভাবে দেখছেন?
ড. কামাল: আমি তো মনে করি, সংবিধানেই বিধান রয়েছে, যাতে এ ধরনের বিতর্ক না হয়। আমরা সংবিধান মেনে চলার কথা বলি। এখন সেটা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আরও দায়িত্বশীলভাবে বলবেন, সেটাই তো প্রত্যাশিত। সংবিধান বলে দিয়েছে, যখন সংবিধান ব্যাখ্যার প্রশ্ন আসবে, তখন সেটা সর্বোচ্চ আদালতই দেবেন। যদি রায় নিয়ে মতভিন্নতা দেখা দেয়, তখন কী করা হবে, সেটাও সংবিধানে লেখা আছে। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘আপিল বিভাগের কোনো ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’
প্রথম আলো: কিন্তু সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ কঠোর মন্তব্য রাখছেন।
ড. কামাল: এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। তবে সাধারণভাবে এটাই বলার যে, আমাদের কখনো কারোরই এমন কিছু বলা বা করা সংগত নয়, যাতে জনগণের মনে প্রতীয়মান হয় যে সংবিধানের কোনো ব্যত্যয় ঘটছে। সে কারণে আমি সত্যি বুঝতে অক্ষম যে একটি রায় নিয়ে কেন ও কীভাবে এমন বিতর্ক করা সম্ভব হচ্ছে। সাংবিধানিক শাসন যেখানে আছে, সেখানে এটা স্বীকৃত যে সংবিধানের ব্যাখ্যা সুপ্রিম কোর্ট দেবেন। এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন নিহিত রয়েছে, তেমন অনেক উল্লেখযোগ্য রায়ের মতো এই রায়ও তাঁরা দিয়েছেন।
প্রথম আলো: সরকারের যাঁরা পদে নেই, অন্যত্র আছেন, তাঁরাও অবমাননাকর উক্তি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ড. কামাল: আমি তাঁদের সম্পর্কেও কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে ত
াঁদের উদ্দেশেও বাহাত্তরের সংবিধান থেকেই একটি বিধান নিবেদন করতে চাই। আমরা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ১ উপদফায় লিখেছিলাম, ‘সংবিধান ও আইন মান্য করা...প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।’
প্রথম আলো: কিন্তু যদি রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তার সুরাহার জন্য সংবিধান কী বলে?
ড. কামাল: সর্বোচ্চ আদালতের রায় হোক কিংবা পর্যবেক্ষণ হোক, তা নিয়ে আদালতের চৌহদ্দির বাইরে অনভিপ্রেত বিতর্ক হবে, সেটা সাংবিধানিক কাঠামোতে কল্পনাই করা যায় না। কোনো ব্যাখ্যার দরকার হলে বা কোনো কারণে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে যথাযথ ও প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি মেনে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ আদালতেই নিয়ে যেতে হবে।
এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে সংবিধানে দুটি বিধান আছে। এই দুটি মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যকর। আমি রায় ঘোষণার পর থেকে শুধু এতটুকু বলার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছি, আর সেটা হলো সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করা। যার সারকথা হলো, সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন, তা রায় ঘোষণার দিন থেকে ‘ঘোষিত আইন’, যার প্রতি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করবেন। এখন সাধারণ মানুষের কাছে যদি এতটকুও প্রতীয়মান হয় যে এই সহায়তার পরিবর্তে যে অসহযোগিতা চলছে, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক বলতে হবে।
প্রথম আলো: সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ বলেছে, হাইকোর্টের রায় অধস্তন আদালতের ওপর আর আপিল বিভাগের রায় সব আদালতের অবশ্যপালনীয়। এটা কি সরকার ও সংসদের জন্য অবশ্যপালনীয়, ১১১ অনুচ্ছেদে কিন্তু সরকার বা সংসদের কথা নেই বলে অনেকে উল্লেখ করেন?
ড. কামাল: অবশ্যই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদের এটাই নির্দেশনা। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিতর্ক দেখা দিলে কোথায় কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেটা ভেবেই তো রিভিউ-সংক্রান্ত ১০৫ অনুচ্ছেদ ১৯৭২ সালে লেখা হয়েছিল। সংবিধান নিয়ে ব্যাখ্যা এখন যেভাবে আদালতের বাইরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তার কোনো সুযোগ অন্তত বাহাত্তরের সংবিধান রেখেছে বলে আমি মনে করি না। যদিও বাহাত্তরের সংবিধান রক্ষণের কথাই আমরা বেশি বেশি শুনছি। তবে কথা হলো, সর্বোচ্চ আদালতের রায় মানতেই হবে, সংবিধানে রায় নিয়ে ফ্রিস্টাইল আলোচনার সুযোগ রাখা হয়নি।
প্রথম আলো: অ্যামিকাস কিউরিদের প্রতি অনেকেরই আস্থা আছে যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি রায়ে কোনো ‘তির্যক’ মন্তব্য থাকলে তাঁরাই সর্বাগ্রে সেটা নির্দেশ করতেন। কিন্তু তাঁদের কেউ এমন দাবি করেননি।
ড. কামাল: দেখুন, রায় প্রসঙ্গে কেন ও কোন উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টানা হয়েছে বা হচ্ছে, সেটা একটা বিস্ময়কর বিষয়। অন্তত আমার কাছে সেটা একদম বোধগম্য নয়। মনে হচ্ছে, অনর্থক তোলা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে কথাগুলো রায়ে নেই, কেন সেটা বলা হচ্ছে, তার উত্তর কার-ই বা জানা থাকে, বলুন?
প্রথম আলো: অনেকের ধারণা, রায় না পড়ার কারণেও একটা বিভ্রম তৈরি হতে পারে। যেমন বেশ কিছুদিন পরে এখন রায় পড়ে মন্তব্য করার অনুরোধ করছেন অনেকে।
ড. কামাল: এই মনোভাবকে আমি স্বাগত জানাই। আমি অনুরোধ করব, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও যাতে রায় পড়েন। আমি বিশ্বাস করি, রায় সঠিকভাবে পড়লে এবং অনুধাবন করলে অহেতুক বিতর্ক এড়ানো যাবে। সংবিধান ও রায় নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হতেই পারে। কিন্তু যেভাবে এটা ফ্রিস্টাইলে চলছে, এটা তো কোনো স্বাস্থ্যকর গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ বলে মনে করি না।
প্রথম আলো: আচ্ছা, আপনি কি রায়ের পুরোটা পড়েছেন? আপনি কি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোনো আপত্তিকর উক্তি পেয়েছেন?
ড. কামাল: আমি রায় পড়েছি। এবং আমি বলব, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কোনো ঘাটতি রয়েছে এমন একটি শব্দ পর্যন্ত আমি পাইনি। যাঁরা বলছেন পেয়েছেন, তাঁদের উচিত রায়ের পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করে সেই বাক্য তুলে ধরা। প্রতিকার চাওয়া।
প্রথম আলো: কেউ কেউ দাবি করছেন, সরাসরি বলা হয়নি, ইঙ্গিত করা হয়েছে। আমিত্ব বা এক ব্যক্তির দ্বারা হয়নি। তাঁরা বলছেন, এখানে বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত আছে। ‘আমরা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
ড. কামাল: আমি আবারও বলছি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননাকর কোনো শব্দ বা ইঙ্গিত রায়ে নেই। আমি রায় শুধু পড়িনি, খুব ভালোভাবে পড়েছি। আমি কিছুই পাইনি, যা তাঁর বিপক্ষে গেছে বলে প্রতীয়মান হতে পারে। আর আমরা মনে রাখব, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সই করা সংবিধান কিন্তু ‘আমরা জনগণ’ দিয়ে শুরু হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সেই কথাকেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। আমি মনে করি, রায়ে যেখানে যা আছে, সবটাই বঙ্গবন্ধুর সপক্ষে আছে। শুধু প্রধান বিচারপতি কেন, অন্য বিচারকেরা যাঁরাই বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টেনেছেন, তাঁরাই যথাযথ শ্রদ্ধাভরে তাঁকে চিত্রিত করেছেন। রায়ে জাতির পিতা হিসেবেই তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বলি, বিতর্ক যাঁরাই নিয়ে আসছেন...আমি মনে করি, সেটা হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। বরং রায়ে আমরা দেখি, মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা প্রধান বিচারপতি ১৯৫৬ সালের গণপরিষদে দেওয়া বিতর্ক থেকে শুরু করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আমরা কীভাবে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, সেই বিবরণ রায়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রথম আলো: একজন অ্যামিকাস কিউরি বলেছেন, ‘আমরা জনগণ’ কথাটি এই প্রথম আমাদের জুরুসপ্রুডেন্সে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটা একটা অসাধারণ বিচার বিভাগীয় মাত্রা।
ড. কামাল: আমি তাঁর সঙ্গে একমত।
প্রথম আলো: আরেকটি বিষয় হলো বিচারক নিয়োগ, অপসারণ নিয়ে এত বিতর্ক, কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়া নেই।
ড. কামাল: বিষয়টি এখন সব মহল থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে। সবাই এটা দাবি করছেন, এটা করা উচিত। একটি আইনের আওতায় এটা আনতে হবে। অনেক আগে থেকেই এটা বলা হচ্ছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখানেই কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রথম আলো: ১০ বিচারকের রায়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচারক বাছাইপ্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের জন্য কতিপয় নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বিচার বিভাগের অংশটুকুর বাস্তবায়ন প্রতীয়মান হয় না।
ড. কামাল: দেখুন, দেশের বিরাজমান পরিবেশে এ নিয়ে আলোচনা করার পরিবেশ নেই। কারণ, অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই সুন্দরভাবে চলছে। সুতরাং, আপাতত এ নিয়ে কথা নয়। এ নিয়ে আপনার সঙ্গে ভবিষ্যতে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
প্রথম আলো: সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে আপনারা বাহাত্তর সালে বিধান করেছিলেন যে বিচারকেরা অবসরে গিয়ে কেউ প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কর্মে নিযুক্ত হবেন না। জিয়াউর রহমানের ফরমানে বিচারিক ও আধা বিচারিক পদের বিধান আনা হয়।
ড. কামাল: আমরা এটা সুচিন্তিতভাবেই ১৯৭২ সালে বিধান করেছিলাম যে, অবসর গ্রহণের পরে বিচারকেরা কোনো কাজে যোগ দেবেন না। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে এখন বলব, বিচারকদের কর্ম-আয়ু শেষ হওয়ার পরে অন্য আর কোনো লাভজনক পদে তাঁদের নিয়োগ হওয়া উচিত নয়। কারণ, এই নিয়োগের আশা যাঁদের থাকে, তাঁরা সেই লক্ষ্যে, এমনকি মনের অজান্তেও প্রভাবিত হতে পারেন। আর সেটা স্বাধীনভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পথে একটা অন্তরায়। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার ধারণায় এটা একটা ক্ষতি ডেকে আনে। আমি তাই সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ ১৯৭২ সালে যেমন ছিল, অবিকল তেমনটার প্রতিস্থাপন দেখতে চাই।
প্রথম আলো: আপিল বিভাগের রায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি এসেছে।
ড. কামাল: আমি একে স্বাগত জানাই।
প্রথম আলো: অতীতে অষ্টম সংশোধনী ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় কিন্তু বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু এবারে হয়নি।
ড. কামাল: এই রায় প্রদানে সাতজন বিচারকই যে একমত হয়েছেন, সেটা অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ। সে কারণেও এই রায় একটি ঐতিহাসিক রায়। আমি বলব, আপিল বিভাগের ফুল কোর্টের একটি সর্বসম্মত রায়ের প্রতি সবার উচিত আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ
ড. কামাল: ধন্যবাদ।
প্রথম আলো 
Powered by Blogger.