Header Ads

রক্তমাখা খাতার ভাঁজে মেয়েকে খোঁজেন মা



স্কুলছাত্রী রিশা হত্যার এক বছর


‘দুপুরের খাবার খেতে মেয়ের জন্য অপেক্ষা, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পর মা-মেয়ের একসঙ্গে খাওয়া, অসুস্থ হলে মেয়ের হাতে ওষুধ সেবন’- এসবই এখন মা তানিয়া হোসেনের স্মৃতি।

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা হত্যার এক বছর পর যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তানিয়া হোসেন বলেন, আমার মেয়ে নেই, কিন্তু তার স্মৃতি একদিনও ভুলতে পারিনি। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন ওকে মনে পড়ে না।

তিনি বলেন, মেয়ের পড়ার শব্দে সকালে ঘুম ভাঙত আমার ও তার বাবার। রিশার পড়ার চেয়ার-টেবিল ছুঁয়ে, ঘুমানোর কক্ষ ঘুরে, ঘরের দেয়ালে দেয়ালে বাঁধানো তার ছবি দেখে এখন সময় কাটে তার। আর বেশি মনে পড়লে রক্তমাখা খাতার ভাঁজে রিশাকে খুঁজে ফিরেন তিনি।

তানিয়া হোসেন আরও বলেন, রিশা স্কুল থেকে ফিরেই আম্মু বলে জড়িয়ে ধরত। এক বছর মেয়ের মুখে আম্মু ডাক শুনি না। ওর কণ্ঠে আম্মু ডাক শুনতে খুব ইচ্ছে করে। তিনি বলেন, মেয়ের পড়ার শব্দে এখন আর ঘুম ভাঙে না। রিশা ছিল তাদের বড় সন্তান, কত স্মৃতি ওকে ঘিরে। এমন কোনো দিন নেই, ওর কথা মনে পড়ে না। মেয়ে হত্যাকারীর ফাঁসি চাই বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তানিয়া হোসেন বলেন, রিশা পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিল। ওর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু ঘাতকের ছুরিকাঘাতে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

এদিকে মামলার বিচারিক কাজ শেষ পর্যায়ে এসে আদালত পরিবর্তন হওয়ায় ঝুলে গেছে বিচার প্রক্রিয়া। রায় ঘোষণার কয়েকদিন আগে আদালত পরিবর্তন করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠী ও পরিবার। হতাশা থেকে মামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন রিশার বাবা রমজান হোসেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, মামলার কার্যক্রম ভালোভাবেই চলছিল। মামলার ২৬ সাক্ষীর মধ্যে ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। ২৭ আগস্ট এ মামলার রায় ঘোষণার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে আসামিপক্ষের আইনজীবী ভুল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আদালত পরিবর্তন করায় বিচার কার্যক্রম ঝুলে গেছে।

তিনি বলেন, রায় ঘোষণার কয়েকদিন আগে এভাবে আদালত পরিবর্তন করায় আমি হতাশ। আমি আর মামলা চালাব না। মেয়ে হত্যার বিচারের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

রিশার মামা মুন্না যুগান্তরকে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী ভুল তথ্য দিয়ে আদালত পরিবর্তন করিয়েছেন। মামলার সাক্ষীদের অনুরোধ করে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ানো হয়েছে। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানো ছিল খুবই কষ্টকর। এখন আদালত পরিবর্তন করায় আবারও সাক্ষীদের সাক্ষ্য নিয়ে জটিলতায় পড়তে হবে। ঝুলে যাবে মামলার বিচার কার্যক্রম।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রিন্সিপাল মো. আবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রিশা হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছি এবং আইন অনুযায়ী ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। একই স্কুলের শিক্ষার্থী এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. আল-আমিন যুগান্তরকে বলেন, আসামি গ্রেফতার হল, সাক্ষী দিলাম; কিন্তু বিচার শেষ হল না। ঘাতেকের ফাঁসি চাই। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।

রিশার পুরান ঢাকার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার দেয়ালে দেয়ালে তার ছবি টানানো। রিশা নেই, তবুও পড়ার টেবিলে গোছানো রয়েছে বই-খাতা ও ব্যবহৃত নানা শিক্ষা উপকরণ। আর আলমারির ভেতরে যত্নে রাখা হয়েছে রিশার রক্তমাখা খাতা।

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিশাকে ছুরিকাঘাত করে বখাটে ওবায়দুল হক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ আগস্ট মারা যায় রিশা। ওবায়দুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার একমাত্র আসামি ওবায়দুলের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল অভিযোগ গঠন করেন আদালত।
zugantor
Powered by Blogger.