Header Ads

চারিদিকে ষড়যন্ত্রের আভাস, কি ঘটছে দেশে ?

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: ষোড়শ সংশোধনীর রায় ঘিরে দেশে যে ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। ভেতরে ভেতরে চলছে দেন-দরবার, প্রকাশ্যে চলছে বাকযুদ্ধ। জনগণ কোনটা বিশ্বাস করবে? ফলে জনমনে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

রায়ের পর ১২ আগস্ট প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন ‘তার সঙ্গে বিচারপতির দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে, আরো কথা হবে’। এছাড়া বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ চার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাতের পর ধারণা করা হচ্ছিল বিষয়টি গোপনেই সুরাহা হয়ে যাচ্ছে। আইনমন্ত্রীও সে ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে সবাইকে প্রধান বিচারপতিসহ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে সাবধানে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।  

শনিবারও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি এবং নেতা প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্যে করে কড়া ভাষায় কথা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন তিনি ইত্যাদি… ইত্যাদি…। অন্যদিকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক রাজনৈতিক নেতার ভূমিকায় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে ‘এক হাত’ নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। 

অন্যদিকে রবিবার সকালে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট প্রকাশ সংক্রান্ত মামলার শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘মিডিয়াতে অনেক কথা বলছেন। কোর্টে এসে অন্য কথা বলেন। আপনাকে নয়, আপনাদের বলছি- বলেন কবে কি হবে। আপনারা ঝড় তুলছেন, আমরা কোনো মন্তব্য করেছি? ধৈর্য ধরেছি, যথেষ্ট ধরেছি।’
 
প্রধান বিচারপতি এও বলেন, ‘পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে (নওয়াজ শরীফ) ইয়ে (অযোগ্য) করেছেন। সেখানে কিছুই (আলোচনা-সমালোচনা) হয়নি। আমাদের আরো পরিপক্কতা দরকার।’
  
সবমিলেই পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতীয়মান হয় যে, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপোড়েন এখনো মিটেনি। ভেতরে-বাইরেও কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। 

জানি না কতদূর সত্য, তবে মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে এবং লোকমুখে শোনা যাচ্ছে- মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার আনুষ্ঠানিক বৈঠক হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হবে যেকোনো সময়ে। বঙ্গভবনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। বৈঠকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা যে হবে তা নিশ্চিত। বঙ্গভবনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বৈঠকের প্রস্তুতির কথা স্বীকার করেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়- সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
 
দেশের চারদিকে যখন লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি, খোলা আকাশের নীচে মানবেতর জীবনযাপন করছে, ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে। ঠিক সে মুহূর্তে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে এ ধরনের দ্বন্দ্ব নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় রয়েছে ষোড়শ সংশোধনীর রায়। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কোনো মতেই হারতে চায় না। এক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ের বিষয়টি অবশ্য অনেক পর্যবেক্ষকই বুঝতে অক্ষম। ক্ষমতাসীনরা কোন প্রক্রিয়ায় জয় করতে চায়।

বলা যায়- ষোড়শ সংশোধনী মামলার পর্যবেক্ষণ নিয়ে শুরুতে চুপচাপই ছিলো ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে ওই রায়ে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে অবৈধ ক্ষমতা দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও রায় নিয়ে খোশআমদেদের  শেষ নেই দলটির নেতাদের। প্রকাশ্যে রায়কে অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি নেতাদের উল্লাস প্রকাশ নিয়ে দলটির ভেতরেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, না জানার কারণেই এটি ছিলো কৌশলগত ভুল তাদের। অন্যদিকে, শুরুতে কয়েকদিন চুপ থাকার পর অনেকটা দলগতভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আওয়ামী লীগের সব নেতা এ রায়ের সমালোচনা করছেন। প্রকাশ্যেই তারা সমালোচনায়মুখর হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার।  এতে অনেকটাই সফল হয়েছেন বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন তিনি আকারে-ইঙ্গিতে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন। সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক কতদূর যান- সেদিকে অনেকেই খেয়াল রাখছেন। অনেকেই তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের সমালোচনায় মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা অতীতের সব রেকর্ডই  ভেঙেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে উচ্চ আদালতের কোনো রায়ের প্রকাশ্যে এমন কঠোর সমালোচনা নজিরবিহীন। তবে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় তা নিয়ে সর্বত্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। 

আইনিভাবে এ রায় মোকাবিলা করার কথা বলেছেন সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সরকার রিভিউর জন্য তৈরি হচ্ছে বলেও মত তার। এরই মধ্যে রায়ের সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা হয়েছে।তবে এ রিভিউ বিচারপতি এস কে সিনহার জমানায় হবে না তার পরে হবে সে প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব এখনো মেলেনি। দৃশ্যত এ নিয়ে সরকারে দুই ধরনের মত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রায় রিকল করে যেন পর্যবেক্ষণে পরিবর্তন আনে এ নিয়ে পর্দার অন্তরালে সরকার পক্ষ চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এ পরিস্থিতিতে সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে একদফা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বঙ্গভবনেও সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। আলোচনা রয়েছে, সরকারি দলের নীতি-নির্ধারকরা বিকল্পগুলোও চিন্তা করছেন। এ নিয়ে হয়তো তারা কঠোর কোনো সিদ্ধান্তের দিকেও যেতে পারেন। তবে আইনবিদরা মনে করেন, এ প্রশ্নে সরকারের সামনে আইনি সুযোগ খুবই সীমিত। নেই বললেই চলে। বিচারকদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা না হলে রিভিউতে এই রায় পরিবর্তনের সুযোগ খুবই ক্ষীণ। কেননা, আপিল বিভাগের যেসব বিচারক এই রায় দিয়েছেন তারাই মূলত রিভিউ করবেন, ফলে তারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ কোন যুক্তিতে পরিবর্তন করবেন!  

এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে গভীর ষড়ন্ত্রের কথা। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেছেন, ‘বিদেশে বসে বিএনপি সরকারকে হটানোর ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি বলেছেন, সব জানি আমরা। কোথায়, কারা কারা যাচ্ছে, কী আলাপ হচ্ছে? লন্ডনের খবর, দুবাইয়ের খবর, ব্যাংককের খবর, কী কী শলা-পরামর্শ হচ্ছে, কোন কোন পথ খোঁজা হচ্ছে শেখ হাসিনার সরকারকে হটানোর জন্য। এইসব খবর এই তথ্য প্রবাহের যুগে গোপন থাকে না। সব আমরা জানি। কারা কারা এ ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়ছে, সব খবর আছে আমাদের কাছে।’ এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রী-এমপিদের মুখে একই কথা- শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে গভীর চক্রান্ত চলছে। এতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতিতে সরগরম হলেও সবার চোখেমুখে কিছুটা আতঙ্কের ছাপ। তাহলে দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে? এ প্রশ্ন এখন সবার।

এদিকে পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের এ টানাপোড়ন সহসাই শেষ হবার নয়। কেননা, আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। যেগুলোতে নির্বাহী বিভাগ ফের তোপের মুখে পড়তে পারেন। 

নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে যখন একধরনের টানাপড়েন চলছে তখন নির্বাচন কমিশন তার সংলাপ শুরু করেছে। নাগরিক সমাজের পর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও সংলাপ করেছে ইসি। তবে আগের পথেই হাঁটছেন এই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার নেতৃত্বাধীন কমিশন যে তেমন কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে না সেটা অনেকটাই খোলাসা করেই বলে দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সংঙ্গে সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুস্পষ্ট বার্তা- রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটে আনতে সমঝোতার কোনো উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন নেবে না। সিইসি বলেছেন, ২৪ আগস্ট থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসি’র যে সংলাপ শুরু হবে, সেখানে কোনো দলের ভোটে আসা- না আসার বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না। সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গেও তিনি বলেছেন, ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে কি-না সে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। কেউ চাইল বা না চাইল-তার উপর নির্ভর করে কিছু হবে না।

ফলে সহজেই যে দেশের এই গুমোট পরিবেশ কেটে যাবে সে ধরনের কোনো আদালমত লক্ষ্য করাও যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি আরো গোলাটে হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মধ্যেও। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়- সহসাই এই গুমোট পরিবেশ কেটে যাচ্ছে না। এর মধ্যে যদি দৈব্যবশত কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে। অর্থাৎ দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চা ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে যা হবার তাই হচ্ছে এখন। বর্তমানে চারদিকে গুমোট পরিস্থিতি। দেশে না জানি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা সর্বমহলে থাকলেও কী হতে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। 

সবশেষে বলবো- সব পক্ষই দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে ক্ষমতা ভোগ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই দ্বন্দ্ব থেকে সহজে বের হয়ে দেশপ্রেম নিয়ে জনসাধারণের কল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনা ও দায়িত্ব পালনের জনগণের এমন প্রত্যাশা দৈব্যবশত আকাঙ্খা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে চতুর্মুখী এই দ্বন্দ্ব কোন দিকে গড়ায় তা দেখতে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে আমাদেরকে।

Powered by Blogger.